খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৬ জুন ২০২৫
আজ ২৬ জুন—শহীদ জননী জাহানারা ইমামের প্রয়াণ দিবস। ১৯৯৪ সালের এই দিনে বাংলাদেশের ইতিহাসে এক সাহসী, সংগ্রামী ও আদর্শিক নারীর জীবনাবসান ঘটে। কিন্তু মৃত্যু তাঁকে থামাতে পারেনি—তিনি আজও জ্বলজ্বলে উপস্থিত আমাদের চেতনায়, আমাদের বিবেকের বুকে।
জাহানারা ইমাম শুধু একজন মা নন; তিনি এক মুক্তিযুদ্ধের প্রতীক, ন্যায়ের পক্ষের এক দৃঢ় কণ্ঠ, যিনি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। বিশেষত ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হওয়া তাঁর সন্তান রুমী এবং স্বামীর মৃত্যু তাঁর জীবনকে যন্ত্রণার খণ্ডচিত্রে পরিণত করলেও তিনি তা থেকে এক মহৎ সংগ্রামের আলো জ্বালিয়েছেন।
জাহানারা ইমাম ১৯২৯ সালের ৩ মে কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। পিতা সৈয়দ আবু মোহাম্মদ ছিলেন একজন সরকারি কর্মকর্তা। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষাজীবন শুরু করে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে তিনি শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হন এবং বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রচারে নিবেদিত ছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধের সময় জাহানারা ইমামের বড় ছেলে শাফি ইমাম রুমী ছাত্রাবস্থায়ই মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হওয়ার পর রুমী আর ফিরে আসেননি। এরপর তাঁর স্বামী সৈয়দ তাফাজ্জল হোসেনও অসুস্থ হয়ে মারা যান। সেই ব্যথা, সেই ক্ষতি, সেই বেদনা তিনি শক্তিতে রূপান্তর করেন।
তিনি তাঁর দিনলিপি ও স্মৃতিকথা লিখতে শুরু করেন, যা পরবর্তীতে ‘একাত্তরের দিনগুলি’ নামে বিখ্যাত গ্রন্থে রূপ নেয়। এটি শুধু একটি স্মৃতিকথাই নয়, এটি এক জাতির জাগরণের দলিল। তাঁর লেখায় একজন মায়ের কষ্ট, বেদনা, আশাবাদ এবং সাহসী উচ্চারণ একাকার হয়ে গেছে।
১৯৯২ সালে শহীদ জননী জাহানারা ইমাম ‘একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’ গঠন করেন। এই কমিটির নেতৃত্বে তিনি ঘাতক দালালদের বিচারের দাবিতে দেশব্যাপী গণ-আন্দোলন গড়ে তোলেন। এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যুদ্ধাপরাধের বিচার দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যুতে পরিণত হয়।
তিনি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়ে গেছেন। তাঁর দৃঢ় মনোবল, আপসহীনতা এবং মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করার অসাধারণ ক্ষমতা তাঁকে বাঙালির ইতিহাসে স্থায়ী আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
১৯৯৪ সালের ২৬ জুন যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কিন্তু তাঁর কণ্ঠ থেমে গেলেও, তাঁর আদর্শ ও সংগ্রাম আজও দেশের নানা প্রান্তে প্রতিধ্বনিত হয়।
জাহানারা ইমামের মৃত্যুর পর তাঁর স্বপ্নের ধারাবাহিকতায় যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া একসময় শুরু হয়। ২০১৩ সালের গণজাগরণ মঞ্চ সেই আন্দোলনের উত্তরাধিকারই বহন করে।
শহীদ জননী জাহানারা ইমাম শুধু একজন লেখিকা বা সংগঠক নন; তিনি এক চলমান আন্দোলনের নাম। তিনি দেখিয়ে গেছেন কীভাবে ব্যক্তি-শোককে জাতীয় প্রেরণায় রূপান্তর করা যায়। তিনি আমাদের শিখিয়ে গেছেন সত্যের জন্য লড়াই কিভাবে করতে হয়, কীভাবে ইতিহাসের ঋণ শোধ করতে হয়।
আজ তাঁর প্রয়াণ দিবসে আমরা তাঁকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি। তাঁর সাহস, তাঁর আদর্শ, তাঁর নেতৃত্বের চেতনাই আমাদের ভবিষ্যতের পথচলার প্রেরণা হয়ে থাকুক।
খবরওয়ালা/এমএজেড