খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: 23শে পৌষ ১৪৩২ | ৬ই জানুয়ারি ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
শীতকাল মানেই বিয়ে, পূজা ও সামাজিক উৎসবের মৌসুম। রংপুর অঞ্চলে এই সময় শোলা শিল্পীরা সব চেয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন। বিয়ে, অন্নপ্রাশন, পূজা ও অন্যান্য ধর্মীয় অনুষ্ঠানের জন্য শোলার তৈরি বিভিন্ন সামগ্রীর চাহিদা প্রতিবারের মতো এই শীতেও কয়েকগুণ বেড়ে গেছে।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন (বিসিক)-এর তথ্য অনুযায়ী, রংপুর অঞ্চলে অন্তত ৫০০টির বেশি পরিবার শোলা শিল্পের সঙ্গে জড়িত। এরা বিয়ের মুকুট, দেব-দেবীর মূর্তি, ঐতিহ্যবাহী খেলনা এবং সাজসজ্জার বিভিন্ন সামগ্রী তৈরি করেন। নভেম্বর থেকে এপ্রিল মাসকে শোলার পণ্যের বিক্রির সবচেয়ে উপযুক্ত সময় হিসেবে ধরা হয়।
শোলা কারিগরদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতিটি মুকুট সাধারণত ৪০০–৮০০ টাকায় বিক্রি হয়। পাইকারি ক্রেতারা অগ্রিম অর্ডার দিয়ে রাখেন। লালমনিরহাট সদর উপজেলার সাধুটারী গ্রামের রামানুজ বর্মণ (৫০) বলেন, “সারা বছরই শোলার কাজ করি, তবে শীতকালে ব্যস্ততা সবচেয়ে বেশি। প্রতিটি মুকুট বিক্রি থেকে ২৫০–৩৫০ টাকা লাভ হয়। প্রতি বছর ৭–৮ লাখ টাকার পণ্য বিক্রি করি।”
| পণ্যের ধরন | প্রতি একক বিক্রয় মূল্য (টাকা) | গড়ে কারিগরের লাভ (টাকা) | বিক্রির সংখ্যা (প্রতি বছর) | মোট বিক্রি (টাকা) |
|---|---|---|---|---|
| মুকুট | ৪০০–৮০০ | ২৫০–৩৫০ | ১,০০০–২,০০০ | ৪–৮ লাখ |
| প্রতিমা | ৫০০–১,০০০ | ৩০০–৪০০ | ৫০০–১,০০০ | ৩–৬ লাখ |
| অন্যান্য সাজসজ্জা | ২০০–৫০০ | ১০০–২৫০ | ২,০০০–৩,০০০ | ৩–৫ লাখ |
শোলা শিল্পে দীর্ঘদিন যুক্ত কারিগররা জানান, কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় আয় কিছুটা কমলেও প্রাচীন শিল্প ও ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য অনেকে এখনও এই কাজ করে যাচ্ছেন। সাধুটারীর বাসিন্দা বাসনা রানী (৪৪) বলেন, “বাপ-ঠাকুরদার আমল থেকে আমরা শোলা শিল্প করি। হিন্দুদের বিয়েতে ও অন্নপ্রাশনে শোলার মুকুট পরানো এখনো বাধ্যতামূলক, তাই চাহিদা কখনো শেষ হয় না। একজন দক্ষ কারিগর দিনে ৫–৬টি মুকুট তৈরি করতে পারেন।”
তবে নতুন প্রজন্ম এই কাজে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। রংপুর শহরের মাহিগঞ্জ এলাকার ৬৫ বছর বয়সী কারিগর সুধীর চন্দ্র সেন বলেন, “এ কাজে ধৈর্য ও সময়ের ব্যাপক প্রয়োজন। নতুন প্রজন্মে কেউ আসতে চায় না। এখন শোলা সংগ্রহও কঠিন হয়ে গেছে, তাই দূরদূরান্ত থেকে কিনে আনতে হয়।” তিনি জানালেন, বছরে প্রায় ১০ লাখ টাকার শোলার সামগ্রী বিক্রি করেন।
লালমনিরহাটের হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতা হীরালাল রায় (৭০) বলেন, “শোলা সামগ্রী দামি না হলেও দৃষ্টিনন্দন। বিয়ের মঞ্চ ও মণ্ডপ সাজাতে এখনও কারিগরদের দরকার। সরকার যেন এই ঐতিহ্য ও শিল্প রক্ষায় উদ্যোগী হয়।”
রংপুর অঞ্চলের শোলা শিল্প সম্প্রদায় শীতকালে বিয়ের মৌসুমের চাহিদা অনুযায়ী ব্যস্ত সময় পার করলেও, কাঁচামালের অভাব, নতুন প্রজন্মের আগ্রহহীনতা ও শিল্প সংরক্ষণের প্রয়োজন এই শিল্পকে দীর্ঘমেয়াদে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।