খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
আর্থিক সংকটে জর্জরিত শ্রীলঙ্কাকে পুনর্গঠনের লক্ষ্যে এক ঐতিহাসিক ও সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে দেশটির নবনির্বাচিত সরকার। গত মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) শ্রীলঙ্কার পার্লামেন্টে দীর্ঘ ৪৯ বছরের পুরোনো ‘পার্লামেন্টারি পেনশন অ্যাক্ট’ বাতিলের প্রস্তাব পাস করা হয়েছে। এর ফলে এখন থেকে দেশটির সংসদ সদস্য এবং তাঁদের বিধবা স্ত্রীরা অবসরকালীন কোনো রাষ্ট্রীয় পেনশন বা বিশেষ ভাতা পাবেন না। প্রেসিডেন্ট অনুরা কুমারা দিশানায়েকের নেতৃত্বাধীন বামপন্থী এনপিপি (NPP) সরকার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী রাজনীতিবিদদের বিশেষ সুযোগ-সুবিধা কমিয়ে আনার এই বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করল।
শ্রীলঙ্কার আইনমন্ত্রী হর্ষনা নানায়াক্কারা পার্লামেন্টে এই প্রস্তাব উত্থাপন করার সময় সংসদ সদস্যদের নৈতিক দায়িত্ব ও জনগণের আস্থার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বর্তমানে সাধারণ মানুষ মনে করে না যে সংসদ সদস্যরা পাঁচ বছর দায়িত্ব পালন করেই আজীবন পেনশন পাওয়ার যোগ্য। এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে মূলত রাষ্ট্রের বিপুল পরিমাণ অর্থ সাশ্রয় হবে এবং সরকারি কর্মচারীদের সঙ্গে সংসদ সদস্যদের বিদ্যমান বৈষম্য দূর হবে।
পুরোনো বনাম নতুন ব্যবস্থার তুলনামূলক চিত্র:
| বিষয় | পূর্ববর্তী আইন (সাবেক) | বর্তমান অবস্থা (নতুন) |
| ন্যূনতম পদের মেয়াদ | মাত্র ৫ বছর সংসদ সদস্য থাকলেই পেনশন। | কোনো পেনশন সুবিধা নেই। |
| সুবিধাভোগী | সংসদ সদস্য ও তাঁদের বিধবা স্ত্রী। | কারো জন্যই পেনশন বরাদ্দ নেই। |
| ভাতার উৎস | সরাসরি রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে আজীবন। | সম্পূর্ণ বাতিল করা হয়েছে। |
| প্রেক্ষিত | সরকারি চাকরিতে যেখানে ১০ বছর প্রয়োজন। | রাজনীতিবিদদের জন্য বিশেষ অগ্রাধিকার রহিত। |
২২০ সদস্যের এই আইনসভায় শাসক দলের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় প্রস্তাবটি পাসের ক্ষেত্রে কোনো বেগ পেতে হয়নি। সংসদীয় ভোটাভুটিতে ১৫৪ জন আইনপ্রণেতা এই সিদ্ধান্তের পক্ষে ভোট দেন, বিপরীতে বিপক্ষে ভোট পড়ে মাত্র ২ জন সংসদ সদস্যের। তবে বিরোধী দলীয় নেতা সাজিথ প্রেমাদাসা এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করে বলেন যে, অবসরের পর সামাজিক নিরাপত্তা না থাকলে সংসদ সদস্যরা তাদের আর্থিক সচ্ছলতা নিশ্চিত করতে দুর্নীতির পথে পা বাড়াতে পারেন। যদিও জনমতের চাপে বিরোধীদের এই যুক্তি টেকেনি।
প্রেসিডেন্ট অনুরা কুমারা দিশানায়েকের সরকার গত সেপ্টেম্বর মাস থেকেই সাবেক নেতাদের বিলাসবহুল জীবনযাপনের ওপর লাগাম টেনে ধরেছে। ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কার নজিরবিহীন অর্থনৈতিক ধসের পর থেকেই সাধারণ মানুষের মনে রাজাপাকসে পরিবারসহ অভিজাত রাজনীতিবিদদের প্রতি তীব্র ক্ষোভ ছিল। সেই ক্ষোভ প্রশমিত করতেই সরকার একের পর এক কঠোর সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।
১. বাসভবন ও বিলাসিতা রোধ: সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপাকসে ও গোটাবায়া রাজাপাকসেকে সরকারি বাংলো ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে।
২. নিরাপত্তা ও জনবল হ্রাস: সাবেক নেতাদের জন্য বরাদ্দকৃত হাজার হাজার ব্যক্তিগত দেহরক্ষী ও সচিবালয় কর্মী প্রত্যাহার করা হয়েছে।
৩. বিলাসবহুল গাড়ি ও জ্বালানি: সরকারি খরচে ব্যবহৃত শত শত বিলাসবহুল গাড়ি জব্দ করে সাধারণ দপ্তরে ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং জ্বালানি বরাদ্দ সীমিত করা হয়েছে।
শ্রীলঙ্কার এই সিদ্ধান্ত বিশ্ব রাজনীতিতে বিশেষ করে দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোতে এক অনন্য নজির সৃষ্টি করেছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, রাজনীতিবিদদের সেবকের ভূমিকায় ফিরিয়ে আনতে এবং রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় এই ব্যয় সংকোচন নীতি অত্যন্ত কার্যকর হবে। সাধারণ মানুষের করের টাকায় রাজনীতিবিদদের বিলাসিতা বন্ধের এই মডেল এখন শ্রীলঙ্কার সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বড় ভূমিকা রাখবে।