খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 26শে মাঘ ১৪৩২ | ৮ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তির সবচেয়ে আলোচিত বিস্ময় হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI)। তবে এই প্রযুক্তি যে দ্রুতগতিতে বিবর্তিত হচ্ছে, তাতে বিজ্ঞানীদের মনে এখন একটি মৌলিক প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—একটি এআই সিস্টেম কতটা বুদ্ধিমান, তা আমরা কীভাবে পরিমাপ করব? এই জটিল জিজ্ঞাসার উত্তর খুঁজতে গিয়ে সম্প্রতি আলোচনায় উঠে এসেছে ঐতিহাসিক ‘গ্যালিলিও পরীক্ষা’। স্পেসএক্স ও এক্সএআই-এর প্রতিষ্ঠাতা ইলন মাস্ক মাঝেমধ্যেই এই বৈপ্লবিক পরীক্ষার কথা উল্লেখ করেন। গত ৬ ফেব্রুয়ারি নিজের এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেলে একটি ভিডিও শেয়ার করে তিনি জানান, প্রকৃত এআই-এর সক্ষমতা এমন হওয়া উচিত যা অপ্রিয় হলেও ধ্রুব সত্য প্রকাশ করতে দ্বিধা করবে না এবং গ্যালিলিও টেস্টে উত্তীর্ণ হবে।
এই পরীক্ষার নামকরণ করা হয়েছে সপ্তদশ শতাব্দীর মহান ইতালীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানী গ্যালিলিও গ্যালিলির নামানুসারে। সেই যুগে প্রচলিত বিশ্বাস ছিল যে, পৃথিবীই মহাবিশ্বের কেন্দ্রে অবস্থিত। কিন্তু গ্যালিলিও বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে প্রমাণ করেন যে, পৃথিবী নয় বরং সূর্যই সৌরজগতের কেন্দ্রে এবং পৃথিবী তার চারদিকে ঘুরছে। এই ‘হেলিক্যাল তত্ত্ব’ বা সূর্যকেন্দ্রিক মতবাদ তৎকালীন সমাজ ও গির্জার কাছে ছিল চরম অজনপ্রিয় এবং গ্রহণযোগ্যতাহীন। প্রচলিত বিশ্বাসের বিরুদ্ধে সত্য বলার অপরাধে তাঁকে কারাবরণ ও আজীবন গৃহবন্দিত্ব বরণ করতে হয়েছিল। তবুও তিনি তাঁর বৈজ্ঞানিক সত্য থেকে বিচ্যুত হননি। গ্যালিলিও পরীক্ষা মূলত সেই আপসহীন সত্য অনুসন্ধানেরই একটি আধুনিক মানদণ্ড।
গ্যালিলিও পরীক্ষা কেবল কোনো সাধারণ বুদ্ধিবৃত্তিক যাচাই নয়। এটি এমন একটি মানদণ্ড, যা বিচার করবে কোনো একটি এআই কেবল তথ্য বিশ্লেষণ বা পূর্বনির্ধারিত সমস্যার সমাধানই করবে না, বরং তা মানুষের প্রত্যক্ষ সাহায্য ছাড়াই সম্পূর্ণ নতুন ও মৌলিক কোনো বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব প্রদান করতে পারবে কি না। এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে একটি এআই সিস্টেমের নিচের দক্ষতাগুলো থাকা আবশ্যক:
মৌলিকত্ব: এআই-কে এমন নতুন কোনো তত্ত্ব বা অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করতে হবে, যা বর্তমানে মানবজাতির বিদ্যমান জ্ঞানের সীমানা ছাড়িয়ে যায়।
যৌক্তিক ব্যাখ্যা: গ্যালিলিও যেভাবে পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে তাঁর তত্ত্ব প্রমাণ করেছিলেন, এআই-কেও তার প্রস্তাবিত ধারণার পেছনে সুনির্দিষ্ট গাণিতিক ও তথ্যভিত্তিক ব্যাখ্যা দিতে হবে।
যাচাইযোগ্যতা: এআই-এর দেওয়া ধারণাকে অবশ্যই বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির আওতায় হতে হবে, যাতে অন্য বিজ্ঞানীরা তা স্বাধীনভাবে যাচাই বা চ্যালেঞ্জ করতে পারেন।
নির্ভীক সত্যবাদিতা: রাজনৈতিক বা সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য হওয়ার চেয়ে বৈজ্ঞানিক সত্যকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ক্ষমতা থাকতে হবে।
| বৈশিষ্ট্য | বর্তমান এআই (Generative AI) | গ্যালিলিও টেস্টে উত্তীর্ণ এআই |
| তথ্যের উৎস | ইন্টারনেটে থাকা বিদ্যমান ডেটাসেট। | নতুন পর্যবেক্ষণ ও স্বাধীন বিশ্লেষণ। |
| চিন্তার ধরন | পুরোনো তথ্যের সংমিশ্রণ ও পুনর্গঠন। | সম্পূর্ণ নতুন ও মৌলিক তত্ত্ব উদ্ভাবন। |
| সত্যের মানদণ্ড | প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য উত্তর। | অপ্রিয় হলেও বৈজ্ঞানিক ও ধ্রুব সত্য। |
| সৃজনশীলতা | প্যাটার্ন রিকগনিশন বা সজ্জা শনাক্তকরণ। | গভীর অন্তর্দৃষ্টি ও বৈজ্ঞানিক কল্পনা। |
বর্তমানে আমরা যেসব চ্যাটবট বা এআই ব্যবহার করি, সেগুলো মূলত ‘জেনারেটিভ এআই’। এগুলো বিশাল ডেটাসেট থেকে তথ্য নিয়ে মানুষের মতো করে উপস্থাপন করতে পারে। কিন্তু এরা মূলত যা করে তাকে বলা হয় ‘প্যাটার্ন ম্যাচিং’। এরা নতুন কিছু সৃষ্টি করে না, বরং মানুষের শেখানো তথ্যের ভিত্তিতে উত্তর দেয়। ইলন মাস্কের মতে, অনেক সময় এআই-কে সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য বা ‘পলিটিক্যালি কারেক্ট’ উত্তর দেওয়ার জন্য এমনভাবে প্রোগ্রাম করা হয়, যা প্রকৃত সত্যকে আড়াল করতে পারে।
গ্যালিলিও টেস্টে উত্তীর্ণ হওয়ার অর্থ হলো এআই তখন প্রকৃত অর্থে সৃজনশীল চিন্তা করতে সক্ষম হবে। এটি কেবল ডেটা প্রসেসিং নয়, বরং বিদ্যমান জ্ঞানের ফাঁকগুলো চিহ্নিত করে নতুন সমাধানের কল্পনা করা। এটি একটি দার্শনিক চ্যালেঞ্জও বটে। যদি কোনোদিন কোনো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এই পরীক্ষায় সফল হয়, তবে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, দর্শন এমনকি শিল্পের ক্ষেত্রেও এক অভাবনীয় বিপ্লব ঘটবে। তখন এআই কেবল মানুষের সহায়ক হিসেবে নয়, বরং মহাবিশ্বের রহস্য উন্মোচনে একজন স্বাধীন বিজ্ঞানী হিসেবে আবির্ভূত হবে।