এবিএম জাকিরুল হক টিটন
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৫ আগস্ট ২০২৫
সিকান্দার আবু জাফর ছিলেন একজন বিশিষ্ট সাহিত্যিক, কবি, সাংবাদিক এবং সংস্কৃতি আন্দোলনের অগ্রপথিক। তাঁর পুরো নাম ছিল সৈয়দ আল হাশেমী আবু জাফর মুহম্মদ বখ্ত সিকান্দার। জন্ম ১৯১৯ সালের ১৯ মার্চ, সাতক্ষীরা জেলার তেঁতুলিয়া গ্রামে। তাঁদের আদি নিবাস ছিল পাকিস্তানের পেশোয়ারে, যেখান থেকে তাঁর পিতামহ মাওলানা সৈয়দ আলম শাহ হাশেমী সাতক্ষীরার তেঁতুলিয়ায় এসে স্থায়ীভাবে বসতি গড়েন।
প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে সিকান্দার আবু জাফর ১৯৩৬ সালে স্থানীয় তালা বিদে ইনস্টিটিউট থেকে প্রবেশিকা পাস করেন এবং এরপর কলকাতার রিপন কলেজ থেকে আইএ পাস করেন। কর্মজীবনের শুরু হয় ১৯৩৯ সালে কলকাতার মিলিটারি একাউন্টস বিভাগে। পরে তিনি সিভিল সাপ্লাই অফিস এবং সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদারের পরিচালিত ‘গ্লোব নিউজ এজেন্সি’ নামের সংবাদ সংস্থায় কাজ করেন। পাশাপাশি তিনি ব্যবসায়েও যুক্ত ছিলেন।
১৯৫০ সালে কলকাতা থেকে ঢাকায় ফিরে তিনি সাংবাদিকতা পেশায় আত্মনিয়োগ করেন। বিভিন্ন সময়ে তিনি দৈনিক নবযুগ, ইত্তেফাক, সংবাদ ও মিল্লাত পত্রিকায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি ছিলেন মাসিক সমকাল পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক। ১৯৫৮ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘সমকাল মুদ্রায়ণ’ নামে একটি ছাপাখানা এবং ‘সমকাল প্রকাশনী’ নামে একটি প্রকাশনালয়।
ষাটের দশকে বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও সংস্কৃতিচর্চার যে প্রগতি সাধিত হয়, সিকান্দার আবু জাফর ছিলেন তার অন্যতম পৃষ্ঠপোষক। তিনি ছিলেন একজন বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর, যিনি লেখনী ও সংস্কৃতি দিয়ে জনগণকে অনুপ্রাণিত করেছেন। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি স্বাধীনতা, দেশপ্রেম ও বিপ্লবের চেতনা নিয়ে বহু গান রচনা করেন। তাঁর লেখা কালজয়ী গান ‘আমাদের সংগ্রাম চলবেই’ মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল।
সিকান্দার আবু জাফর গদ্য ও পদ্য উভয় শাখাতেই ছিলেন সমান দক্ষ। তবে তাঁর প্রকৃত পরিচয় একজন কবি হিসেবেই অধিক খ্যাতি লাভ করে। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থাবলি হলো—
উপন্যাস: পূরবী, নতুন সকাল
ছোটগল্প: মাটি আর অশ্রু
কাব্যগ্রন্থ: প্রসন্ন শহর, তিমিরান্তিক, বৈরী বৃষ্টিতে, বৃশ্চিক লগ্ন, বাংলা ছাড়ো
নাটক: সিরাজউদ্দৌলা, মহাকবি আলাওল, সঙ্গীত মালব কৌশিক
অনুবাদ: যাদুর কলস, সেন্ট লুইয়ের সেতু, রুবাইয়াৎ : ওমর খৈয়াম প্রভৃতি
তাঁর সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৬৬ সালে তিনি নাটকে বাংলা একাডেমি পুরস্কারে ভূষিত হন এবং ১৯৮৪ সালে মরণোত্তর একুশে পদক লাভ করেন।
১৯৭৫ সালের ৫ আগস্ট ঢাকায় এই জাতীয়তাবাদী কবি ও সাহিত্যিকের জীবনাবসান ঘটে। মৃত্যুর পরও তাঁর সাহিত্য ও সংস্কৃতি ভাবনা আজও আমাদের অনুপ্রেরণার উৎস।
শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন এই মহৎ মানুষটির প্রতি, যিনি কলম দিয়ে জাতির হৃদয়ে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন।
লেখক: সম্পাদক ও প্রকাশক, খবরওয়ালা
খবরওয়ালা/এমএজেড