খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 6শে ফাল্গুন ১৪৩২ | ১৮ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
দীর্ঘ ৯ বছরের আইনি প্রক্রিয়া শেষে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় সাত বছরের স্কুলছাত্র তামীম হোসেন হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করেছেন আদালত। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘটিত এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের দায়ে তিন আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং একজনকে দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬) বিকেলে সিরাজগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক মো. ইকবাল হোসেন এই জনাকীর্ণ আদালতে এই রায় প্রদান করেন।
মামলার বিবরণ ও আদালত সূত্রে জানা যায়, নিহত তামীম হোসেন উল্লাপাড়া উপজেলার নরসিংহপাড়া গ্রামে তার নানা মোজাম্মেল হকের বাড়িতে থেকে স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করত। ২০১৭ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি বিকেলে নানার বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর তামীম রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়। পরিবারের সদস্যরা অনেক খোঁজাখুঁজি করেও ওই রাতে তার কোনো সন্ধান পায়নি।
পরদিন ১১ ফেব্রুয়ারি ভোরে প্রতিবেশীদের মাধ্যমে স্বজনরা জানতে পারেন যে, নরসিংহপাড়া এলাকার বাবুল আকতারের একটি সরিষা ক্ষেতের ভেতর তামীমের নিথর দেহ পড়ে আছে। সংবাদ পেয়ে পুলিশ ও পরিবারের সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখতে পান, শিশুটির গলায় রশি পেঁচানো এবং মাথার পেছনে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। এই মর্মান্তিক ঘটনায় নিহতের বাবা সোলেমান ফকির বাদী হয়ে উল্লাপাড়া মডেল থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
পুলিশি তদন্তে বেরিয়ে আসে যে, স্থানীয় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিরোধের জেরে নিরপরাধ এই শিশুটিকে বলির পাঁঠা বানানো হয়েছিল। গ্রেপ্তারকৃত আসামিরা আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করলে মামলার জট খোলে।
একনজরে আদালতের রায়ের সারসংক্ষেপ:
| দণ্ডের ধরন | আসামির সংখ্যা | সাজার বিবরণ | অর্থদণ্ড ও অনাদায়ে সাজা |
| যাবজ্জীবন কারাদণ্ড | ৩ জন | আমৃত্যু সশ্রম কারাদণ্ড | ২০,০০০ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও ৬ মাস সাজা |
| স্বল্পমেয়াদী কারাদণ্ড | ১ জন (মান্নান আকন্দ) | ২ বছরের কারাদণ্ড | ৫,০০০ টাকা জরিমানা |
| খালাস | ০ জন | – | – |
সিরাজগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট শাকিল মো. শরিফুল হায়দার (রফিক সরকার) গণমাধ্যমকে জানান, আসামিরা অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে আধিপত্যের লড়াইয়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে বা প্রতিশোধ নিতে মাসুম শিশু তামীমকে হত্যা করেছিল। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে চার্জশিট দাখিল করেন এবং রাষ্ট্রপক্ষ থেকে আমরা পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছি।
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, আসামিদের ১৬৪ ধারার জবানবন্দি এবং পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্যপ্রমাণ বিচারকের সামনে অপরাধীদের অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করেছে। রায়ে রাষ্ট্রপক্ষ সন্তোষ প্রকাশ করলেও নিহতের পরিবার আসামিদের সর্বোচ্চ সাজা অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ড প্রত্যাশা করেছিল।
একটি সাত বছরের শিশুর এমন করুণ মৃত্যু সে সময় উল্লাপাড়াসহ পুরো জেলায় শোকের ছায়া ফেলেছিল। সরিষা ক্ষেতে গলায় রশি লাগানো লাশের ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি ওঠে। দীর্ঘ সময় পর হলেও এই রায়ের মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে মনে করছেন আইন সংশ্লিষ্টরা। এই রায় সমাজের অপরাধীদের জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে যে, আধিপত্যের লোভে নিরপরাধ প্রাণ কেড়ে নিলে আইনের হাত থেকে রেহাই পাওয়া অসম্ভব।
আদালত সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, রায় ঘোষণার পরপরই সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের কড়া নিরাপত্তায় সিরাজগঞ্জ জেলা কারাগারে পাঠানো হয়েছে। কারাদণ্ডপ্রাপ্ত মান্নান আকন্দের বিরুদ্ধে অপরাধে সহায়তার প্রমাণ পাওয়ায় তাকে লঘু দণ্ড দেওয়া হয়েছে।