খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৫ মার্চ ২০২৬
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে অসংখ্য বীর ও বীরাঙ্গনার অবদান আজও যথেষ্ট আলোচিত হয়নি। ইতিহাসের অনেক সাহসী চরিত্র সময়ের প্রবাহে আড়ালে পড়ে গেছে। অথচ তাঁদের ত্যাগ, সাহস এবং দেশপ্রেম স্বাধীনতার পথকে সুগম করেছিল। তেমনই এক বিস্ময়কর নারীযোদ্ধা ছিলেন আজাদ হিন্দ ফৌজের সদস্যা নীরা আর্য। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর জীবন রক্ষার জন্য তিনি এমন এক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, যা ইতিহাসে বিরল—নিজের স্বামীকেই হত্যা করেছিলেন তিনি।
ব্রিটিশ শাসনের শেষ পর্যায়ে স্বাধীনতা আন্দোলন যখন তীব্র হয়ে উঠেছিল, তখন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর নেতৃত্বে গঠিত আজাদ হিন্দ ফৌজ ভারতকে স্বাধীন করার লক্ষ্যে সংগঠিতভাবে সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছিল। এই বাহিনীর একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা ছিল নারীদের জন্য গঠিত ‘রানি ঝাঁসি রেজিমেন্ট’। এই রেজিমেন্টের সাহসী সদস্যাদের অন্যতম ছিলেন নীরা আর্য।
একদিন নেতাজির ওপর আক্রমণের উদ্দেশ্যে গোপনে পরিকল্পনা করা হয়। ব্রিটিশ শাসনের অনুগত এক ভারতীয় কর্মকর্তা শ্রীকান্ত জয়রঞ্জন দাস সুযোগ পেয়ে নেতাজিকে লক্ষ্য করে গুলি চালান। কিন্তু সেই গুলি লক্ষ্যে না লেগে নেতাজির গাড়ির চালকের গায়ে লাগে। মুহূর্তের মধ্যে পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝে ফেলেন নীরা আর্য। তিনি তখন সেখানে উপস্থিত ছিলেন। নেতাজির জীবন যে মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে তা উপলব্ধি করেই তিনি কোনো দ্বিধা না করে অস্ত্র দিয়ে আক্রমণকারীকে হত্যা করেন।
ঘটনার পর প্রকাশ পায় এক চমকপ্রদ সত্য—যাকে তিনি হত্যা করেছেন, সেই ব্যক্তি তাঁর নিজের স্বামী শ্রীকান্ত জয়রঞ্জন দাস। দেশপ্রেমের কাছে ব্যক্তিগত সম্পর্কও যে তুচ্ছ হয়ে যেতে পারে, নীরা আর্যের এই ঘটনাটি তার এক অনন্য উদাহরণ। এই ঘটনার পর নেতাজি গভীর আবেগে নীরা আর্যকে ‘নাগিনী’ উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন।
নীরা আর্যের জীবন ছিল সংগ্রাম ও ত্যাগে ভরা। তাঁর জন্ম, পরিবার ও শিক্ষা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিচের সারণিতে উপস্থাপন করা হলো।
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| জন্মতারিখ | ৫ মার্চ ১৯০২ |
| জন্মস্থান | খেকড়া শহর, বাগপত জেলা, উত্তর প্রদেশ |
| পিতা | শেঠ ছজুমল, একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী |
| শিক্ষাজীবন | প্রধানত কলকাতায় কাটে |
| ভাষাজ্ঞান | বাংলা, হিন্দি, ইংরেজিসহ একাধিক ভাষায় দক্ষতা |
| সংগঠন | আজাদ হিন্দ ফৌজ |
| সামরিক শাখা | রানি ঝাঁসি রেজিমেন্ট |
| বিশেষ ভূমিকা | গুপ্তচর ও যোদ্ধা |
ছোটবেলা থেকেই নীরা আর্যের মধ্যে দেশপ্রেমের শক্ত বোধ গড়ে ওঠে। শিক্ষিত ও মেধাবী এই নারী স্বাধীনতার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে আজাদ হিন্দ ফৌজে যোগ দেন। তিনি শুধু একজন যোদ্ধাই ছিলেন না, একই সঙ্গে একজন দক্ষ গুপ্তচর হিসেবেও কাজ করতেন। ব্রিটিশ বাহিনীর নানা গোপন তথ্য সংগ্রহ করে তিনি নেতাজির কাছে পৌঁছে দিতেন, যা স্বাধীনতা সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
স্বামী হত্যার ঘটনার পর ব্রিটিশ সরকার তাঁকে গ্রেপ্তার করে। তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি ঘোষণা করা হয় এবং তাঁকে দ্বীপান্তরের সাজা দেওয়া হয়। কারাগারে তাঁর ওপর চালানো হয় অমানবিক নির্যাতন। বিভিন্নভাবে শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার সহ্য করতে হলেও তিনি কখনো নিজের আদর্শ থেকে সরে আসেননি।
ভারত স্বাধীন হওয়ার পর তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পেলেও জীবনে আর স্বচ্ছলতা ফিরে পাননি। স্বাধীনতার জন্য জীবন বাজি রাখা এই বীরাঙ্গনাকে শেষ জীবনে জীবিকা নির্বাহ করতে হয়েছিল ফুল বিক্রি করে। দারিদ্র্য ও অবহেলার মধ্যেই কেটে যায় তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায়।
১৯৯৮ সালের ২৬ জুলাই প্রায় নিঃস্ব অবস্থায় পৃথিবী থেকে বিদায় নেন এই সাহসী নারীযোদ্ধা। অথচ তাঁর আত্মত্যাগ ও বীরত্ব ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে বিশেষ মর্যাদার দাবিদার।
আজও লোকগাথা, লোকসংগীত এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের স্মৃতিতে ‘নীরা নাগিনী’ সাহস, দেশপ্রেম এবং আত্মত্যাগের এক অনন্য প্রতীক হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছেন। তাঁর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—স্বাধীনতার জন্য ত্যাগের সীমা কত গভীর হতে পারে।