খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক:
প্রকাশ: শুক্রবার, ১০ অক্টোবর ২০২৫
প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সংঘাত, বাস্তুচ্যুতি বা মানবিক বিপর্যয়ে সরাসরি প্রভাব পড়ে মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অঞ্চলভেদে দুর্যোগ যখন আসে, তখন শুধু অবকাঠামো নয়; বিপর্যস্ত হয় মানুষের জীবনও। কিন্তু মানসিক রোগের চিকিৎসাব্যবস্থা খুবই অপ্রতুল। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সারা দেশে অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে চলেছে মানসিক সমস্যা এবং এই রোগে আক্রান্তের সংখ্যা।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর প্রায় ১৯ শতাংশ (প্রায় তিন কোটি ) কোনো না কোনো মানসিক রোগে ভুগছে। এর মধ্যে প্রায় ৯৫ শতাংশ কখনো মানসিক স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আসেনি। যারা চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে আসছে, তাদের মধ্যে ৭৫ শতাংশই সিজোফ্রেনিয়া ও বাইপোলার ডিস-অর্ডারে আক্রান্ত। এসব রোগীর ৪৫.২৬ শতাংশের বয়স ১৫ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে।
এমন পরিস্থিতিতে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও আজ পালিত হচ্ছে ‘বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস’। প্রতিবছর ১০ অক্টোবর দিবসটি পালিত হয়। এবারের প্রতিপ্রাদ্য বিষয় ‘বিপর্যয় কিংবা জরুরি অবস্থায় মানসিক স্বাস্থ্যসেবা যেন পাওয়া যায়’। দিবসটি উপলক্ষে সচেতনতামূলক নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়।
মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিপর্যয় বা জরুরি অবস্থায় মানসিক স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা থাকলেও চিকিৎসা নেওয়া রোগীর হার খুব কম। রানা প্লাজা ধস থেকে শুরু করে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও মাইলস্টোন স্কুল ট্র্যাজেডি—এই তিনটি বড় বিপর্যয়েই বেশির ভাগ আহতকেই বিষণ্নতা ও মানসিক সমস্যায় ভুগতে দেখা গেছে। তবে এসব ঘটনায় আহতদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়নি।
নানামুখী চাপের মুখে মাইলস্টোন স্কুল কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ বিমানবাহিনী, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল এবং ব্র্যাকের সহায়তায় ক্যাম্পাসে চিকিৎসা ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা চালু করে। সেখানে সেবা নিতে বা শুধুই দেখতে অনেকে আসছেন। তবে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ঘটনায় সেটিও সম্ভব হয়নি।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের তথ্য মতে, অর্ধশত রোগীর তথ্য রয়েছে, যারা স্বেচ্ছায় চিকিৎসা নিয়েছে। আহত ব্যক্তিরা মনে করে, তাদের কোনো মানসিক সমস্যা নেই। জুলাই ফাউন্ডেশন ও সরকারের নেওয়া একাধিক উদ্যোগ এ ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে।
৭৫% সিজোফ্রেনিয়া ও বাইপোলার ডিস-অর্ডারে আক্রান্ত: চলতি বছরের এপ্রিল থেকে জুন মাস পর্যন্ত জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে চিকিৎসা নেওয়া ৯১৯ জন রোগীর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৭৫ শতাংশই সিজোফ্রেনিয়া ও বাইপোলার ডিস-অর্ডারে আক্রান্ত। এসব রোগীর ৪৫ শতাংশের বয়স ১৫ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. জোবায়ের মিয়া গণমাধ্যমকে বলেন, সিজোফ্রেনিয়া একটি গুরুতর মানসিক রোগ। এই রোগে রোগী নিজে বুঝতে পারে না বা কখনো স্বীকার করে না যে তার কোনো মানসিক রোগ আছে।
সিজোফ্রেনিয়া কেন হয়, তার নির্দিষ্ট কারণ জানা যায়নি। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মূল কারণ হচ্ছে জিনেটিক। মস্তিষ্কে কিছু নিউরোট্রান্সমিটার বা কেমিক্যালের অস্বাভাবিকতা, ঘাটতি বা তারতম্য হলে এই রোগটি হয়ে থাকে। সাধারণত ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সের মধ্যে সিজোফ্রেনিয়া রোগের উপসর্গ বেশি দেখা দেয়। তবে যেকোনো বয়সেই এটি হতে পারে।
ডা. মো. জোবায়ের মিয়া বলেন, আক্রান্ত ব্যক্তির চিন্তার অস্বাভাবিকতা, অন্যকে সন্দেহ, হ্যালুসিনেশন হয়। ভ্রান্ত বিশ্বাসের মধ্যে থাকে। সিজোফ্রেনিয়া আক্রান্তদের আত্মহত্যা করার ঝুঁকি থাকে, অন্যকে হত্যা করারও ঝুঁকি থাকে। নিজের ক্ষতি করার প্রবণতা থাকে। এ ছাড়া পড়ালেখা, অফিসের কাজ, ব্যক্তিগত কাজ, অর্থাৎ সব কাজে তার মনোযোগ ও সক্ষমতা কমে যায়।
বছরে ২০ হাজার আত্মহত্যা: স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির অর্থায়নে পরিচালিত জরিপ বলছে, দেশে এক লাখ মানুষে ১২ জন আত্মহত্যা করছে। বছরে আত্মহত্যা করছে ২০ হাজার ৫০৫ জন। ডিপ্রেশন, উদ্বেগ, বাইপোলার ডিস-অর্ডারের মতো মানসিক ব্যাধি আত্মহননের প্রবণতার পেছনে বড় কারণ হিসেবে কাজ করে। মা-বাবার বিচ্ছেদ, পারিবারিক সহিংসতা ও ঘরে অনিরাপদ পরিবেশের মতো পারিবারিক দ্বন্দ্ব ও ভাঙনের ঘটনা আরেকটি কারণ।
এ ছাড়া পরীক্ষায় ব্যর্থতা, অতিরিক্ত প্রত্যাশা, প্রতিযোগিতামূলক মানসিকতার মতো শিক্ষাজনিত চাপে পড়েও অনেকে আত্মহত্যার কথা চিন্তা করে। সামাজিক চাপ ও বুলিং, অপমান, অবহেলা, একাকিত্ব, নেশা ও ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ, ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশা ইত্যাদিও রয়েছে।
দ্বিমুখী আবেগের রোগ ‘বাইপোলার ডিস-অর্ডার’: জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মুনতাসীর মারুফ বলেন, বাইপোলার ডিস-অর্ডার আবেগজনিত একটি মানসিক রোগ। নারী-পুরুষ উভয়েই এ রোগে আক্রান্ত হতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের গবেষকদলের জরিপ অনুয়ায়ী, বাংলাদেশে ১৮ বছর ও তদূর্ধ্ব বয়সীদের ০.৪ শতাশ, অর্থাৎ প্রতি হাজারে চারজন এ ধরনের রোগে আক্রান্ত।
ডা. মুনতাসীর মারুফ বলেন, এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের আবেগের দুটি পর্যায় থাকে। একটি পর্যায় হচ্ছে ম্যানিয়া বা হাইপোম্যানিয়া। ম্যানিয়া পর্যায়ে ব্যক্তিরা অস্বাভাবিক আনন্দ-ফুর্তি অথবা বিরক্ত বোধ করে, নিজেকে অতি বিত্তশালী বা ক্ষমতাবান মনে করে, কথা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বলে।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের ২০১৮-১৯ সালের তথ্য বলছে, দেশের প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর প্রায় ১৯ শতাংশ কোনো না কোনো মানসিক রোগে ভুগছে। ১৮ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে প্রায় ৭ শতাংশ বিষণ্নতা এবং প্রায় ৫ শতাংশ উদ্বেগজনিত রোগে ভুগছে। অথচ মানসিক সমস্যায় ভোগা রোগীদের ৯২ শতাংশ বিজ্ঞানসম্মত কোনো মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পায়নি বা নেয়নি।
খবরওয়ালা/এসআর