এবিএম জাকিরুল হক টিটন
প্রকাশ: সোমবার, ১৮ আগস্ট ২০২৫
“ত্রিবেণী তীর্থপথে কে গাহিল গান, জাগায়ে তুলিল মোর আকুল পরান”
উপমহাদেশের খ্যাতনামা শাস্ত্রীয় সংগীতশিল্পী আচার্য চিন্ময় লাহিড়ী বাংলা সঙ্গীত জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।
তিনি জন্মগ্রহণ করেন ১৯২০ সালের ২০ মার্চ শিল্প-সংস্কৃতি ও সাহিত্যের লীলাভূমি পাবনায়। যদিও তাঁর জন্ম পাবনায়, শৈশব কেটেছে প্রকৌশলী পিতা জীবচন্দ্র লাহিড়ীর কর্মস্থল লক্ষ্ণৌয়ে।
লক্ষ্ণৌতেই রবীন চট্টোপাধ্যায়ের কাছে তাঁর প্রাথমিক সঙ্গীত শিক্ষা শুরু হয়। এরপর মরিস কলেজ অব মিউজিকে পণ্ডিত রতন ঝঙ্কারের নিকট তালিম নেন। পরবর্তীতে দিলীপ বেদি, খুরশীদ আলী খাঁ ও ছোটে খাঁর মতো ওস্তাদদের কাছ থেকেও শিক্ষা গ্রহণ করেন।
চিন্ময় লাহিড়ীর সঙ্গীতে কোনো পারিবারিক বংশপরম্পরা ছিল না। কেবল নিজের আগ্রহ, একনিষ্ঠ প্রচেষ্টা ও সাধনার ফলেই তিনি বাংলা তথা ভারতবর্ষের সঙ্গীত জগতে প্রতিষ্ঠা পান। তাঁর গানে শাস্ত্রীয় রীতির সঙ্গে মধুর রস ও গভীর আত্মনিবেদন মিলেমিশে এক অনন্য আবহ সৃষ্টি করত।
১৯৪৪ সালে এইচএমভি থেকে তাঁর প্রথম গান রেকর্ড হয়। ১৯৫২ সালে অল বেঙ্গল মিউজিক কনফারেন্সে সঙ্গীত পরিবেশন করে তিনি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।
তিনি শুধু গায়কই ছিলেন না, বরং সঙ্গীত পরিচালক, কণ্ঠশিল্পী ও শিক্ষক হিসেবেও সমান খ্যাতি লাভ করেন। চলচ্চিত্রে তাঁর প্রথম প্লেব্যাক ছিল ‘মানদণ্ড’ ছবিতে। আর ‘শাপমোচন’ ছবিতে প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে দ্বৈতকণ্ঠে গাওয়া “ত্রিবেণী তীর্থ পথে কে গাহিল গান” আজও শ্রোতার হৃদয়ে অমলিন। ছবিটিতে তিনি সুচিত্রা সেনের গৃহশিক্ষকের ভূমিকা অভিনয়ও করেছিলেন।
শিক্ষক হিসেবেও চিন্ময় লাহিড়ী ছিলেন সমান দক্ষ। রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালকে তিনি অধ্যাপনা করেছেন, আবার গ্রামোফোন কোম্পানিতে ট্রেনার হিসেবেও কাজ করেছেন। তাঁর তৈরি অনেক ছাত্র-শিষ্য সঙ্গীত জগতে সুনাম কুড়িয়েছেন।
শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বিভিন্ন রাগে তাঁর বিশেষ অবদান রয়েছে। তিনি সুরেশচন্দ্র চক্রবর্তীর সৃষ্ট ‘নন্দকোষ’ রাগ পরিবেশন করে সারা ভারতের সঙ্গীতমহলে আলোড়ন তুলেছিলেন। এছাড়া তিনি নিজেও একাধিক রাগ সৃষ্টি করেছেন—যেমন শ্যামকোষ, যোগমায়া, প্রভাতি টোড়ী, রজনীকল্যাণ, কুশুমীকল্যাণ, গান্ধারিকা, নাগরঞ্জনী, মঙ্গলতী, শুভ্রা প্রভৃতি।
লেখক হিসেবেও তাঁর পরিচয় ছিল উজ্জ্বল। সঙ্গীত বিষয়ে রচিত গ্রন্থ ‘মগনগীত’ ও ‘তানমঞ্জরী’ তাঁকে বিশেষ মর্যাদা এনে দেয়।
তাঁর জীবন ছিল একাধারে শিল্পী, স্রষ্টা ও শিক্ষক হিসেবে সার্থক। মরিস কলেজ তাঁকে ‘সঙ্গীতবিশারদ’ উপাধিতে ভূষিত করে।
১৯৮৪ সালের ১৭ আগস্ট এই কিংবদন্তি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতশিল্পীও মহাপ্রয়াণ করেন।
আজও তাঁর গানে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে সৌন্দর্য, মাধুর্য আর গভীরতা অনুরণিত হয়
তাঁর কণ্ঠ যেন সত্যিই জাগিয়ে তোলে আমাদের আকুল পরান।
খবরওয়ালা/আশ