স্মরণে খান বাহাদুর আহছানউল্লা

শিক্ষা সংস্কারক খান বাহাদুর আহছানউল্লা
বাংলার শিক্ষা ও আধ্যাত্মিক ইতিহাসে এক অনন্য নাম—খান বাহাদুর আহছানউল্লা। তিনি শুধু একজন শিক্ষাবিদ নন, ছিলেন একজন যুগদ্রষ্টা শিক্ষা সংস্কারক, মানবকল্যাণে নিবেদিত সাধক এবং চিন্তার দিক থেকে সময়ের বহু আগে এগিয়ে থাকা এক মহাপুরুষ।
তিনি জন্মগ্রহণ করেন ২৭ ডিসেম্বর ১৮৭৩ সালে, তৎকালীন যশোর জেলার অন্তর্গত (বর্তমান সাতক্ষীরা জেলার) কালিগঞ্জ উপজেলার নলতা গ্রামে, এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে। শৈশবকাল থেকেই মেধা, শৃঙ্খলা ও নৈতিকতায় তিনি ছিলেন ব্যতিক্রম।
উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি অধ্যয়ন করেন কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে, সেখান থেকে দর্শনশাস্ত্রে এম.এ. ডিগ্রি অর্জন করেন। তার চিন্তা ও মননের গভীরতা পরবর্তীতে শিক্ষা সংস্কারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
কর্মজীবনে তিনি অবিভক্ত বাংলার শিক্ষা বিভাগের ডাইরেক্টর (মুসলিম শিক্ষা) পদে অধিষ্ঠিত হন—যে পদটি সে সময় প্রায় একচেটিয়াভাবে ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের জন্য সংরক্ষিত ছিল। এই পদে অধিষ্ঠিত হয়ে তিনি মুসলিম শিক্ষার ক্ষেত্রে যুগান্তকারী সংস্কার সাধন করেন এবং শিক্ষা ব্যবস্থায় ন্যায়, শৃঙ্খলা ও আধুনিকতা প্রতিষ্ঠা করেন।
তিনি ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেটর, সিন্ডিকেটের সদস্য এবং লন্ডনের রয়েল সোসাইটির সদস্য—যা তার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির প্রমাণ বহন করে।
শিক্ষা ক্ষেত্রে তাঁর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবদান হলো—
পরীক্ষার খাতা ক্রমিক নম্বর দিয়ে মূল্যায়নের পদ্ধতি চালু করা, যা স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করে।
মুসলিম শিক্ষার প্রসারে পাঠ্যক্রম সংস্কার এবং বাস্তবভিত্তিক শিক্ষা বিস্তারে বহু পাঠ্যপুস্তক রচনা।
এই অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি “খান বাহাদুর” উপাধিতে ভূষিত হন।
শিক্ষা ও সাহিত্যে অবদানের জন্য ১৯৬০ সালে তাঁকে বাংলা একাডেমির ফেলো হিসেবে মনোনীত করা হয়—যা তাঁর কর্মজীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ সম্মাননা।
ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন একজন গভীরভাবে ধর্মপ্রাণ ও নৈতিক মানুষ। সরকারি দায়িত্ব থেকে অবসর গ্রহণের পর তিনি নিজেকে সম্পূর্ণভাবে আধ্যাত্মিক সাধনায় নিয়োজিত করেন এবং পরবর্তীতে পীর হিসেবে মর্যাদা লাভ করেন। তাঁর জীবন ছিল ইবাদত ও মানবসেবার এক অপূর্ব সমন্বয়।
তিনি আত্মজীবনীসহ মোট ৭৭টি গ্রন্থ রচনা করেন—যা শিক্ষা, দর্শন, নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিক চিন্তায় সমৃদ্ধ। মানবকল্যাণের উদ্দেশ্যে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘আহছানীয়া মিশন’—যার মূল দর্শন ছিল
“স্রষ্টার ইবাদত ও সৃষ্টির সেবা”।
এই মহান শিক্ষা সংস্কারক, চিন্তাবিদ ও সাধক ১৯৬৫ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি ইহলোক ত্যাগ করেন। তবে তাঁর আদর্শ, কর্ম ও চিন্তা আজও বাংলা ও উপমহাদেশের শিক্ষা ও মানবসেবার পথে আলোকবর্তিকা হয়ে জ্বলজ্বল করছে।
শ্রদ্ধাঞ্জলি।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।