খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
স্মরণ
বিপ্লবী অনিল মুখার্জি
অনিল মুখার্জি ছিলেন উপমহাদেশের বিপ্লবী আন্দোলন, শ্রমিক রাজনীতি ও কমিউনিস্ট চেতনার এক অকুতোভয় সৈনিক। তিনি একাধারে ছিলেন প্রখ্যাত বিপ্লবী, সংগঠক, রাজনৈতিক তাত্ত্বিক ও লেখক—যাঁর জীবন জুড়ে ছিল শোষণমুক্ত সমাজ গড়ার নিরলস সংগ্রাম।
১৯১২ সালের ১০ অক্টোবর মুন্সিগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন অনিল মুখার্জি। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের উত্তাল সময়েই তাঁর রাজনৈতিক চেতনার উন্মেষ ঘটে। ছাত্রজীবনেই তিনি বিপ্লবী রাজনীতিতে যুক্ত হন এবং ভারতবর্ষ ও পরবর্তীতে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।
১৯৩০ সালে কলেজে অধ্যয়নকালে আইন অমান্য আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণের দায়ে তিনি গ্রেপ্তার হন। মেদিনীপুর জেলে অন্তরীণ থাকাকালে সশস্ত্র বিপ্লবে যুক্ত থাকার অভিযোগে ব্রিটিশ সরকার তাঁকে আন্দামানের কুখ্যাত সেলুলার জেলে নির্বাসিত করে। সেই কারাবাস তাঁর আদর্শকে দমাতে পারেনি; বরং বিপ্লবী প্রত্যয়ে তাঁকে আরও দৃঢ় করেছিল।
১৯৩৮ সালে মুক্তিলাভের পর তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন। শ্রমিক শ্রেণির অধিকার আদায়ের সংগ্রামে তিনি হয়ে ওঠেন এক অগ্রণী সংগঠক। ১৯৪৬ সালে নারায়ণগঞ্জের ঐতিহাসিক সুতাকল শ্রমিক ধর্মঘটে তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী।
১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের পর পূর্ব পাকিস্তানে কমিউনিস্ট রাজনীতিতে যুক্ত থাকার কারণে টানা আট বছর কারাবন্দি জীবন কাটান তিনি। কারামুক্তির পরও রাজনৈতিক তৎপরতার অভিযোগে তাঁকে আত্মগোপনে থাকতে হয়—যে আত্মগোপন চলতে থাকে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত।
১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে অনিল মুখার্জি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন এবং স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষে সংগঠক ও প্রেরণাদাতা হিসেবে ভূমিকা রাখেন। এর আগেও তিনি গোপনে মস্কো সফর করেন এবং পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিনিধি হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অনুষ্ঠিত ৭৫টি কমিউনিস্ট পার্টির মহাসম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন—যা তাঁর আন্তর্জাতিক বিপ্লবী যোগাযোগ ও মর্যাদার স্বাক্ষর বহন করে।
স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে তিনি বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সম্পাদক হিসেবে ১৯৭৩ ও ১৯৮০ সালে নির্বাচিত হন। দলীয় রাজনীতির পাশাপাশি লেখালেখির মাধ্যমেও তিনি বিপ্লবী চিন্তার বিস্তার ঘটান।
তাঁর সম্পাদিত ও রচিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে—
‘সাম্যবাদের ভূমিকা’, ‘শ্রমিক আন্দোলনের হাতে খড়ি’, ‘স্বাধীন বাংলাদেশ সংগ্রামের পটভূমি’, ‘হারানো খোকা’ প্রভৃতি। এসব গ্রন্থ আজও প্রগতিশীল রাজনীতি ও ইতিহাসচর্চায় মূল্যবান দলিল হিসেবে বিবেচিত।
১৯৮২ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি এই আপসহীন দেশপ্রেমিক ও বিপ্লবীর জীবনাবসান ঘটে। তবে তাঁর আদর্শ, সংগ্রাম ও লেখনী আজও শোষণমুক্ত সমাজের স্বপ্নে বিশ্বাসী মানুষদের প্রেরণা জোগায়।
বিপ্লবী অনিল মুখার্জির প্রতি গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।