খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
স্মরণ
দানশীলতার এক গৌরবময় ব্যক্তিত্ব
মহেশ চন্দ্র ভট্টাচার্য
মহেশচন্দ্র ভট্টাচার্য ছিলেন একজন হোমিওপ্যাথিক ঔষধ ব্যবসায়ী, সমাজসেবক ও প্রকৃত দানবীর। তবে তাঁর পরিচয়ের মূল আলোটা পড়ে—নিজের উপার্জিত অর্থ সম্পূর্ণভাবে দেশ, সমাজ ও মানুষের কল্যাণে ব্যয় করার অসামান্য আদর্শে। দানশীলতার ক্ষেত্রে তিনি যে নীরব, নির্লোভ ও স্থায়ী দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন, তা আজও বিরল।
তিনি জন্মগ্রহণ করেন ১৮৫৮ সালের ১ ডিসেম্বর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর উপজেলার বিটঘর গ্রামে। তাঁর পিতা ঈশ্বরদাস তর্কসিদ্ধান্ত ছিলেন একজন প্রাজ্ঞ পণ্ডিত এবং মাতা রামমালা দেবী। পারিবারিক ঐতিহ্য ছিল জ্ঞান ও মানবিকতার চর্চায় সমৃদ্ধ।
চরম দারিদ্র্যের কারণে মহেশচন্দ্র ভট্টাচার্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষালাভের সুযোগ পাননি। তবে জ্ঞানের প্রতি তীব্র আকাঙ্ক্ষা তাঁকে থামাতে পারেনি। তিনি ঘরে বসেই অধ্যয়ন চালিয়ে যান এবং অদম্য মনোবলের জোরে শিক্ষিত ও আত্মনির্ভরশীল হয়ে ওঠেন। পরবর্তীকালে কিছুদিন তিনি বঙ্গ বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
১৮৮৩ সালে মাত্র পঞ্চান্ন টাকা পুঁজি নিয়ে জীবনের সন্ধানে তিনি কলকাতা গমন করেন। সেখানে সততা, পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে হোমিওপ্যাথিক ঔষধ ব্যবসা শুরু করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি ব্যবসায়িক সাফল্য অর্জন করেন, কিন্তু সেই সাফল্যকে ব্যক্তিগত ভোগে নয়—মানুষের কল্যাণে ব্যয় করাই ছিল তাঁর জীবনের ব্রত।
আজীবন সমাজসেবায় নিবেদিত এই মহৎ মানুষটি পিতার স্মৃতির উদ্দেশ্যে ১৯২৩ সালে কুমিল্লা শহরে প্রতিষ্ঠা করেন ঈশ্বর পাঠশালা। এছাড়া ১৯২০ সালে শাকতলা পল্লীতে রামমালা ছাত্রাবাস এবং ১৯৩৫ সালে রামমালা গ্রন্থাগার স্থাপন করেন।
নারী শিক্ষার অগ্রগতিতে তাঁর অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁর আন্তরিক প্রচেষ্টায় কুমিল্লায় গড়ে ওঠে নিবেদিতা বালিকা বিদ্যালয় ও নিবেদিতা ছাত্রীনিবাস। নিজ গ্রামে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন শিক্ষা সংসদ। কাশীধামে প্রতিষ্ঠা করেন ঈশ্বর পাঠশালা টোল। তাঁর উদ্যোগেই ১৯৩৫ সালে স্থাপিত হয় রামমালা রোড ও রামমালা ডাকঘর।
গ্রামের মানুষের পানীয় জলের সংকট দূর করতে তিনি নিজ গ্রামে একটি পুকুর খনন করেন, যেখানে জাতি-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই পানি গ্রহণের অধিকার পেত—এটাই ছিল তাঁর মানবিক দর্শনের প্রকৃত প্রতিফলন।
তীর্থভ্রমণের সময় বৈদ্যনাথে দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে তিনি অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ান। সে সময় প্রতিদিন প্রায় চার-পাঁচশো মানুষকে অন্নদান করতেন—নীরবে, প্রচারহীনভাবে।
১৯৩৫ সালে কালীঘাটে তীর্থযাত্রীদের সুবিধার্থে তিনি একুশ নম্বর টালিগঞ্জে নির্মাণ করেন কালীঘাট যাত্রীনিবাস, যেখানে যাত্রীরা টানা চার-পাঁচ দিন বিনা ভাড়ায় অবস্থান করতে পারতেন। এছাড়া বারানসীতে তিনি তাঁর সহধর্মিণী হরসুন্দরী দেবীর নামে একটি ধর্মশালা প্রতিষ্ঠা করেন।
ব্যবসায়িক ব্যস্ততার মাঝেও মহেশচন্দ্র ভট্টাচার্য সাহিত্যচর্চা থেকে দূরে ছিলেন না। ১৩১২ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত তাঁর গ্রন্থ ‘ব্যবসায়ী’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি নিজ জীবনের কথাও লিখে গেছেন—‘আত্মকথা’ নামে একটি আত্মজীবনীতে।
১৯৪৪ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি এই মহান সমাজহিতৈষী ও দানবীর পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। তবে তাঁর কর্ম, আদর্শ ও মানবপ্রেম আজও বেঁচে আছে—প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে অনুপ্রেরণা হয়ে।