খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 17শে মাঘ ১৪৩২ | ৩০ই জানুয়ারি ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
বাংলাদেশের বহুলপঠিত উপন্যাসগুলোর মধ্যে এক অনন্য নাম—‘হাজার বছর ধরে’। গ্রামীণ মানুষের জীবন, তাদের সুখ-দুঃখ, আশা-হতাশা ও নিরব সংগ্রামের কথা যে গভীর মমতায় উঠে এসেছে এই উপন্যাসে, তা প্রকাশের বহু বছর পরও পাঠকের হৃদয় স্পর্শ করে চলেছে। সময় যত এগিয়েছে, বইটির আবেদন ততই বেড়েছে। এই উপন্যাসের মধ্য দিয়েই জহির রায়হান হয়ে উঠেছেন পাঠকের ভালোবাসায় অমর—হাজার বছর ধরে বেঁচে থাকার যোগ্য এক সাহিত্যিক।
জহির রায়হানের জন্ম ১৯ আগস্ট ১৯৩৫, ফেনী জেলার সোনাগাজী উপজেলার নবাবপুর ইউনিয়নের মজুপুর গ্রামে। স্বল্পায়ু হলেও তাঁর সৃষ্টিজীবন ছিল বিস্ময়করভাবে সমৃদ্ধ।
লেখক হিসেবে তিনি যেমন ছিলেন বিপুল পাঠকপ্রিয়, তেমনি চলচ্চিত্রকার হিসেবেও ছিলেন অসাধারণভাবে সফল। সাহিত্য ও চলচ্চিত্র—দুই অঙ্গনেই তিনি রেখে গেছেন শক্তিশালী ও স্থায়ী ছাপ। উপন্যাস, ছোটগল্প, চলচ্চিত্র, সাংবাদিকতা—সবখানেই ছিল তাঁর সৃজনশীল উপস্থিতি।
ছোটগল্পকার হিসেবেও জহির রায়হানের কৃতিত্ব অনস্বীকার্য। তাঁর লেখা ‘সময়ের প্রয়োজনে’ একসময় পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত ছিল। এছাড়াও তাঁর বহু ছোটগল্প আজও পাঠকের মনে দাগ কেটে আছে।
ভাষা আন্দোলনের পটভূমিতে লেখা তাঁর উপন্যাস ‘আরেক ফাল্গুন’ বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য সৃষ্টি। উপন্যাসটির শেষ লাইন—
“আসছে ফাল্গুনে আমরা কিন্তু দ্বিগুণ হব”—
আজও মানুষের মনে জাগরণ ও প্রতিরোধের দীপ্তি ছড়িয়ে দেয়। ভাষা আন্দোলন নিয়ে তাঁর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাস ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’।
এছাড়াও ‘বরফ গলা নদী’ উপন্যাসে সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম গভীরভাবে উঠে এসেছে। ‘শেষ বিকেলের মেয়ে’ উপন্যাসে জীবন ও ভালোবাসা মিশে গেছে বিনিসুতোর মালার মতো।
চলচ্চিত্রে জহির রায়হান ছিলেন সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে। তাঁর অমর সৃষ্টি ‘জীবন থেকে নেয়া’ বাংলা চলচ্চিত্রকে নিয়ে গেছে অনন্য উচ্চতায়। আজও এই চলচ্চিত্র দর্শকের কাছে সমানভাবে প্রাসঙ্গিক ও আবেদনময়।
নায়করাজ রাজ্জাক অভিনীত প্রথম চলচ্চিত্র ‘বেহুলা’-র পরিচালক ছিলেন জহির রায়হান। তাঁর হাত ধরেই রাজ্জাকের নায়ক হিসেবে যাত্রা শুরু। নায়িকা ববিতাসহ বহু শিল্পীর চলচ্চিত্রে অভিষেক ঘটেছে জহির রায়হানের মাধ্যমে।
‘কাঁচের দেয়াল’, ‘আনোয়ারা’—এসব চলচ্চিত্রে তিনি তুলে ধরেছেন সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা। ষাটের দশকে তাঁর প্রথম পরিচালিত চলচ্চিত্র ‘কখনো আসেনি’। পাকিস্তান আমলের প্রথম রঙিন চলচ্চিত্র ‘সংগম’-এর পরিচালকও ছিলেন তিনি।
সাহিত্যকীর্তির স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ১৯৭২ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (মরণোত্তর) লাভ করেন। পরবর্তীতে ১৯৭৭ সালে একুশে পদক এবং ১৯৯২ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার (উভয়ই মরণোত্তর) প্রদান করা হয় তাঁকে।
তবে জহির রায়হানের সবচেয়ে বড় পুরস্কার ছিল পাঠক ও দর্শকের অকৃত্রিম ভালোবাসা—যা আজও অটুট।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পরদিন, ১৭ ডিসেম্বর ১৯৭১, তিনি ফিরে আসেন স্বদেশের মাটিতে। নিখোঁজ ভাই শহীদুল্লাহ কায়সারকে খুঁজতে শুরু করেন। এক অজ্ঞাত মহলের ফোনে ভাইয়ের সন্ধানের আশ্বাস পেয়ে তিনি মিরপুরের বিহারি অধ্যুষিত এলাকায় যান। কিন্তু সেদিন আর ফিরে আসেননি।
দিনটি ছিল ৩০ জানুয়ারি ১৯৭২, শনিবার।
মাত্র ৩৭ বছর বয়সে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির আকাশ থেকে খসে পড়ে এক উজ্জ্বল ধ্রুবতারা। কিন্তু তাঁর সৃষ্টির আলো নিভে যায়নি—আজও তিনি বেঁচে আছেন তাঁর গল্পে, উপন্যাসে, সিনেমায়, আর মানুষের গভীর ভালোবাসায়।
শ্রদ্ধাঞ্জলি।