খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 21শে ফাল্গুন ১৪৩২ | ৫ই মার্চ ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে উত্তেজনা এখন আর কেবল বাগাড়ম্বরে সীমাবদ্ধ নেই। গত ৪৮ ঘণ্টায় ইরানের নজিরবিহীন ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় উপসাগরীয় দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোর যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে সাম্প্রতিক স্যাটেলাইট ইমেজে। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ অভিযানে ইরানের শীর্ষ নেতাদের হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ নিতে তেহরান যে ‘কঠোর জবাব’ দেওয়ার অঙ্গীকার করেছিল, এই হামলাগুলো তারই প্রত্যক্ষ প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরান এবার অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে তাদের ভৌগোলিক অবস্থানের সুবিধা নিয়েছে। ইসরায়েলের তুলনায় উপসাগরীয় দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলো ইরানের অনেক কাছে হওয়ায়, তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনগুলোর লক্ষ্যভেদের সক্ষমতা বহুগুণ বেড়ে গেছে। বিশেষ করে ‘আরশ-২’ এবং ‘শাহেদ’ সিরিজের ড্রোনগুলো মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় আঘাত হানতে সক্ষম হয়েছে।
নিচে স্যাটেলাইট চিত্রে ধরা পড়া প্রধান পাঁচটি মার্কিন ঘাঁটির ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ তুলে ধরা হলো:
| আক্রান্ত ঘাঁটির নাম ও স্থান | ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ | হতাহত ও বিশেষ মন্তব্য |
| শুয়াইবা বন্দর (কুয়েত) | অস্থায়ী অপারেশন সেন্টার ধ্বংস ও অগ্নিকাণ্ড। | ৬ জন মার্কিন সেনাসদস্য নিহত। |
| ক্যাম্প বুয়েহরিং (কুয়েত) | ড্রোন হামলায় একটি প্রধান ভবন বিধ্বস্ত। | হেলিকপ্টারগুলো অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছে। |
| পঞ্চম নৌবহর ঘাঁটি (বাহরাইন) | স্যাটেলাইট যোগাযোগ টার্মিনাল ধ্বংস। | বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ নৌ-ঘাঁটি আক্রান্ত। |
| সংযুক্ত আরব আমিরাত ঘাঁটি | গুদামঘর ও একাধিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত। | লজিস্টিক সাপোর্ট সেন্টার অচল হয়ে পড়েছে। |
| বিভিন্ন কৌশলগত অবস্থান | অন্তত ৫টি যোগাযোগ টার্মিনাল ধ্বংস। | বহির্বিশ্ব থেকে যোগাযোগের পথ বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা। |
স্যাটেলাইট থেকে প্রাপ্ত ছবিগুলো বিশ্লেষণ করলে একটি বিশেষ প্যাটার্ন বা ধরণ পরিলক্ষিত হয়। ইরান কেবল এলোপাথাড়ি হামলা চালায়নি, বরং তারা সুনির্দিষ্টভাবে মার্কিন ঘাঁটিগুলোর স্যাটেলাইট যোগাযোগ টার্মিনালগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। অন্তত পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনাল ধ্বংস হওয়ার ফলে ওই অঞ্চলের মার্কিন কমান্ড সেন্টারগুলোর সাথে মূল নেটওয়ার্কের সংযোগ সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন বা বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে যুদ্ধের ময়দানে মার্কিন সেনাদের তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া ধীর হয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
আমেরিকা দাবি করেছে যে, তাদের কোটি কোটি ডলার মূল্যের ‘প্যাট্রিয়ট’ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইরানের বেশিরভাগ ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে। তবে বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। প্রতিরক্ষা বলয় ভেদ করে যে গুটিকতক ড্রোন বা মিসাইল ভেতরে ঢুকেছে, সেগুলোই উপসাগরীয় তেলের খনি সমৃদ্ধ দেশগুলোর নিরাপত্তা বলয় তছনছ করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। বিশেষ করে বাহরাইনের মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌ-ঘাঁটিতে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা ওয়াশিংটনকে নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে।
সাউদার্ন কমান্ডের সূত্রমতে, এই হামলাগুলো মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নিরাপত্তা কাঠামোর হৃৎপিণ্ডে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছে। একদিকে যেমন জানমালের ক্ষতি হয়েছে, অন্যদিকে মার্কিন প্রযুক্তি ও সামরিক শ্রেষ্ঠত্বও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। এই নজিরবিহীন পরিস্থিতিতে ট্রাম্প প্রশাসন মধ্যপ্রাচ্যে তাদের অবশিষ্ট ঘাঁটিগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বাড়তি কয়েক হাজার সেনা ও অত্যাধুনিক রাডার সিস্টেম মোতায়েনের কথা ভাবছে।
বর্তমানে পুরো মধ্যপ্রাচ্য এক চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। ইরানের এই ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’ আদতে একটি দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের সূচনা কি না, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে। আগামী দিনগুলোতে মার্কিন পাল্টা পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করছে এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা।