খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫
ব্রহ্মপুত্রের করাল গ্রাস যেন গিলে খেয়েছে শিশুদের ভবিষ্যৎ। কুড়িগ্রামের রাজিবপুর উপজেলার মোহনগঞ্জ ইউনিয়নের চরাইহাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পুরোপুরি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে দেড় বছর আগে। এখন একটি টিনের ছাপড়ার ঘরেই চলছে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত ছয় শ্রেণির পাঠদান। অফিসের কাজ সারতে হচ্ছে স্থানীয় একটি স্যান্ডেলের দোকানে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, স্থানীয় পল্লী চিকিৎসক জাকিরের উঠানে তৈরি টিনের ঘরেই চলছে বিদ্যালয়ের কার্যক্রম। নেই দরজা-জানালা, নেই টেবিল-চেয়ার কিংবা শিক্ষকদের বসার আলাদা জায়গা। অথচ এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সংখ্যা ১২০ জন।
জাকির বলেন, “আমার নিজেরই থাকার জায়গা নেই। তারপরও লেখাপড়া বন্ধ না হয়, সেই ভাবনা থেকে আঙিনার এক কোণে স্কুলের জন্য ঘর তুলতে দিয়েছি। স্যাররা কষ্ট করেন, আমিও কষ্ট করি। কবে যে সরকার স্থায়ী ব্যবস্থা নেবে, আল্লাহই ভালো জানেন।”
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আসাদুজ্জামান জানান, “একটি মাত্র ঘরে ছয়টি শ্রেণির পাঠ নিতে হচ্ছে। যখন প্রথম শ্রেণির ক্লাস চলে, তখন অন্য শ্রেণির শিক্ষার্থীরা বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে। রোদ, বৃষ্টি, শীত-গরমে শিশুরা অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। শিক্ষা অফিসে জানিয়েছি, কিন্তু এখনো কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।”
অফিসরুম না থাকায় শিক্ষকদের নথিপত্রের কাজ চালাতে হচ্ছে পাশের স্যান্ডেলের দোকানে। দোকানদার আব্দুল মান্নান স্বপন বলেন, “বৃষ্টির দিনে স্যাররা বাইরে ভিজে দাঁড়াতেন। কষ্ট দেখে বলেছি, আমার দোকানে বসে কাজ করুন। তবে দোকান বন্ধ থাকলে স্যারদের বাইরে দাঁড়িয়েই থাকতে হয়। এতে আমি যেমন লজ্জা পাই, তারাও অস্বস্তি বোধ করেন।”
পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী সাদিয়া, আরিফা ও ওমর আলী জানায়, ঠিকমতো ক্লাস করা যায় না। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, বৃষ্টি হলে ভিজতে হয়। পড়াও বোঝা যায় না। ফ্যান না থাকায় গরমে কষ্ট হয়। মাঠ না থাকায় খেলাধুলাও করতে পারে না।
অন্য শিক্ষকরা বলেন, “অবকাঠামো নেই, অফিস নেই। শিক্ষকের সম্মানও আজ ভিক্ষুকের মতো অবস্থায় নেমে এসেছে।”
এক অভিভাবক শফিকুল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “অন্য স্কুলের শিক্ষার্থীরা নিয়মিত পড়াশোনা করে বৃত্তির সুযোগ পায়। অথচ আমাদের ছেলে-মেয়েরা ক্লাস করারই পরিবেশ পাচ্ছে না।”
এ বিষয়ে রাজিবপুর উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ফরহাদ হোসেন জানান, “নদীভাঙনের পর জমি না থাকায় কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি। কেউ জমি দিলে দ্রুত স্কুল নির্মাণ করা হবে।”
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফজলে এলাহী বলেন, “বিদ্যালয়টি আমি পরিদর্শন করেছি। জমি না থাকায় নতুন ভবন নির্মাণ সম্ভব হয়নি। বিষয়টি জেলা প্রশাসক ও প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে জানিয়েছি। এখনো কোনো নির্দেশনা পাইনি।”
খবরওয়ালা/এমএজেড