খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ৬ জুন ২০২৬
পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে তীব্র সামরিক উত্তেজনার মধ্যে কুয়েত ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দুটি প্রধান সামরিক ঘাঁটিতে একের পর এক শক্তিশালী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান। এই হামলার পর তেহরান আন্তর্জাতিকভাবে হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছে, পরবর্তীতে যেকোনো ধরনের উসকানি বা আগ্রাসন চালানো হলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেল ও গ্যাস রপ্তানির অন্যতম প্রধান সামুদ্রিক রুট ‘হরমুজ প্রণালি’ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হবে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম মেহের নিউজ এজেন্সি শনিবার (৬ জুন, ২০২৬) এই সামরিক সংঘাত ও হুঁশিয়ারির খবরটি নিশ্চিত করেছে।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) তাদের আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে একটি তেলবাহী ট্যাঙ্কারের অননুমোদিত ও নিয়মবহির্ভূত চলাচলকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিরোধের জেরে ইরান ও মার্কিন বাহিনীর মধ্যে এই সরাসরি সংঘাতের সূত্রপাত হয়। আইআরজিসির পক্ষ থেকে প্রকাশিত ঘটনার বিশদ বিবরণ অনুযায়ী, ঘটনার দিন ভোররাত ১টা ৩০ মিনিটে চারটি তেলবাহী ট্যাঙ্কার আইআরজিসি নেভির সঙ্গে কোনো ধরনের পূর্ব-সমন্বয় না করে এবং তাদের দেওয়া সতর্কবার্তা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করার চেষ্টা করছিল।
ইরানি নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে চূড়ান্ত সতর্কবার্তা জারির পর একটি ট্যাঙ্কারে আঘাত হেনে সেটির গতি রোধ করা হয় এবং বাকি তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজ উল্টো পথে ফিরে যেতে বাধ্য হয়। এই ঘটনার ঠিক আধঘণ্টা পর, অর্থাৎ ভোররাত ২টার দিকে মার্কিন ড্রোনগুলো ওমান উপসাগর ও হরমুজ প্রণালিসংলগ্ন কিশমি দ্বীপ এবং সিরিক এলাকায় অবস্থিত ইরানের দুটি গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ টাওয়ারে আকস্মিক বিমান হামলা চালায়।
মার্কিন ড্রোনের মাধ্যমে ইরানের যোগাযোগ টাওয়ারে হামলার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ও প্রতিশোধ হিসেবে আইআরজিসির অ্যারোস্পেস ফোর্স কুয়েত এবং বাহরাইনের মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোতে একযোগে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বর্ষণ করে। আইআরজিসি নিশ্চিত করেছে যে, তাদের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রগুলো কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন বিমান ঘাঁটি ‘আলি আল-সালেম’ এবং বাহরাইনে মোতায়েন মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের (৫ম ফ্লিট) সদরদপ্তরের প্রধান স্থাপনাগুলোকে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে আঘাত হেনেছে।
এক কড়া বিবৃতিতে রেভল্যুশনারি গার্ডস জানিয়েছে, এই ধরনের আগ্রাসী আচরণের পুনরাবৃত্তি হলে ইরানের পক্ষ থেকে এর চেয়েও বড় এবং সীমাহীন সামরিক জবাব দেওয়া হবে। একই সঙ্গে মার্কিন-ইসরাইলি জোটকে হুঁশিয়ার করে তারা বলেছে, হরমুজ প্রণালি যদি তেল ও গ্যাস রপ্তানির জন্য পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়, তবে বিশ্ব অর্থনীতিতে যে মারাত্মক বিপর্যয় নেমে আসবে—তার সম্পূর্ণ দায় এই জোটকেই নিতে হবে।
ইরান ও মার্কিন বাহিনীর মধ্যে ঘটে যাওয়া এই সরাসরি সামরিক সংঘাতের প্রধান প্রধান তথ্য ও লক্ষ্যবস্তুগুলোর বিবরণ নিচে টেবিলের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
| হামলার পক্ষ | আক্রান্ত লক্ষ্যবস্তু ও স্থান | ব্যবহৃত সামরিক সরঞ্জাম | হামলার সময়কাল ও প্রেক্ষাপট |
| মার্কিন বাহিনী | কিশমি দ্বীপ ও সিরিক এলাকায় অবস্থিত আইআরজিসির দুটি যোগাযোগ টাওয়ার। | ড্রোন (Drones) | ভোররাত ২টা০০ মিনিট; ৪টি তেলবাহী ট্যাঙ্কারকে ইরানি নৌবাহিনী বাধা দেওয়ার পর। |
| ইরানি বাহিনী (আইআরজিসি) |
১. কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন বিমান ঘাঁটি ‘আলি আল-সালেম’। ২. বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের (৫ম ফ্লিট) সদরদপ্তর। |
ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (Ballistic Missiles) | মার্কিন ড্রোন হামলার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ও প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ হিসেবে। |
ইরানের পক্ষ থেকে হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার এই প্রত্যক্ষ হুঁশিয়ারি আন্তর্জাতিক মহলে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। ভৌগোলিক ও কৌশলগতভাবে ওমান ও ইরানের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত এই সংকীর্ণ জলপথটি বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল। বিশ্বজুড়ে সমুদ্রপথে সাশ্রয়ী মূল্যে যে পরিমাণ খনিজ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রপ্তানি করা হয়, তার একটি বিশাল অংশ এই হরমুজ প্রণালি হয়ে বিভিন্ন দেশে পৌঁছায়।
ফলে এই রুটটি বন্ধ হলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে এবং তেলের দাম রেকর্ড পরিমাণে বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কুয়েত ও বাহরাইনে মার্কিন বাহিনীর ওপর সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং এর বিপরীতে হরমুজ প্রণালি বন্ধের এই অনমনীয় অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলেছে এবং আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষকরা এই ঘটনার পর অঞ্চলে নতুন করে বড় ধরনের যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা ব্যক্ত করছেন।