খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ২ মার্চ ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি এক নজিরবিহীন সংকটের মুখে পতিত হয়েছে। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানের পর তেহরান পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ পথ ‘হরমুজ প্রণালী’ অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছে। এই কৌশলগত জলপথটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে ভয়াবহ অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ব্যারেল প্রতি ৮০ ডলার স্পর্শ করেছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল এক বিশাল সংকটের শুরু মাত্র।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সোমবার (২ মার্চ) বিশ্ববাজার খোলার পরপরই তেলের দামে বড় ধরনের লাফ দেখার আশঙ্কা করা হচ্ছে। রাইস্ট্যাড এনার্জির মতো প্রভাবশালী গবেষণা সংস্থাগুলো ধারণা করছে, হরমুজ প্রণালীতে অচলাবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হলে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। এনার্জি ও রিফাইনিংয়ের (আইসিআইএস) ডিরেক্টর অজয় পারমার মনে করেন, সামরিক হামলার চেয়েও বড় প্রভাব ফেলছে সরবরাহ রুটের এই আকস্মিক বন্ধ। তিনি সতর্ক করে বলেছেন যে, বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে এই সপ্তাহান্তেই জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।
বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের বড় একটি অংশ এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল এই রুট দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছাত। ইরান এই রুটটি বন্ধ করে দেওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহে এক বিশাল শূন্যতা তৈরি হয়েছে। নিম্নে বর্তমান সংকটের একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হলো:
| বিষয়ের ক্ষেত্র | যুদ্ধের আগের পরিস্থিতি | বর্তমান (২ মার্চ, ২০২৬) | প্রভাব ও পরিবর্তন |
| ব্যারেল প্রতি তেলের দাম | প্রায় ৭২-৭৫ ডলার | প্রায় ৮০ ডলার (বৃদ্ধির পথে) | প্রায় ১০% তাৎক্ষণিক বৃদ্ধি |
| হরমুজ দিয়ে সরবরাহ | প্রতিদিন ১.৫ কোটি ব্যারেল | সম্পূর্ণ বন্ধ (শূন্য) | সরবরাহ শিকল ভেঙে পড়া |
| দৈনিক নিট তেলের ঘাটতি | কোনো ঘাটতি ছিল না | ৮০ লাখ – ১ কোটি ব্যারেল | বিশ্ববাজারে চরম হাহাকার |
| বাজার পূর্বাভাস | স্থিতিশীল | ১০০ ডলার + হওয়ার শঙ্কা | ভয়াবহ মুদ্রাস্ফীতির ঝুঁকি |
জ্বালানি তেলের এই অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধি কেবল তেলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর ফলে পরিবহন খরচ বহুগুণ বেড়ে যাবে, যা সরাসরি প্রভাব ফেলবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যে। বিশেষ করে আমদানি নির্ভর দেশগুলোর অর্থনীতিতে নতুন করে মুদ্রাস্ফীতির বোঝা চেপে বসতে পারে। খাদ্যশস্য থেকে শুরু করে জীবনরক্ষাকারী ওষুধের দাম বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত যদি দীর্ঘমেয়াদী হয়, তবে বিশ্ব অর্থনীতি এক গভীর মন্দার মুখে পড়তে পারে। ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত হয়ে বিকল্প কিছু রুট ব্যবহারের চেষ্টা করা হলেও তা চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল। ফলে হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমার কোনো সম্ভাবনা দেখছেন না বিশ্লেষকরা।