সিলেট বিভাগে হাম ও নিউমোনিয়ার প্রাদুর্ভাবজনিত পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে আরও দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় নতুন করে দুইজনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে এবং বিভিন্ন হাসপাতালে ৬৯ জন নতুন রোগী ভর্তি হয়েছেন। ফলে চলমান সংক্রমণ পরিস্থিতি নিয়ে স্বাস্থ্য বিভাগ নতুন করে সতর্কতা জারি করেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত একদিনে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় দুই শিশুর মৃত্যু হয়। মৃত শিশুদের মধ্যে একজন মৌলভীবাজার সদর উপজেলার পূর্ব সুলতানপুর এলাকার সজল মিয়ার সাত মাস বয়সী ছেলে সারহান এবং অন্যজন সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলার উজ্জ্বল মিয়ার পাঁচ মাস বয়সী ছেলে আহিয়ান।
সিলেট বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. মাহবুবুল আলম জানিয়েছেন, হামের উপসর্গ ও নিউমোনিয়াজনিত জটিলতায় আক্রান্ত হয়ে শিশু দুটির মৃত্যু হয়েছে। তিনি বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে নতুন করে ৬৯ জন রোগী বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত সিলেট বিভাগে মোট ৩২৭ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে সুনামগঞ্জ জেলায়। স্বাস্থ্য বিভাগের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আক্রান্তের সংখ্যা নিম্নরূপ—
| জেলা |
শনাক্ত হাম রোগী |
| সিলেট |
১০৭ |
| সুনামগঞ্জ |
১৭৮ |
| মৌলভীবাজার |
১৬ |
| হবিগঞ্জ |
২৬ |
| মোট |
৩২৭ |
স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের মতে, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। শিশুদের মধ্যে এ রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং অনেক ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া, অপুষ্টি, ডায়রিয়া, শ্বাসকষ্ট ও অন্যান্য জটিলতা তৈরি করে। বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু এবং যেসব শিশু নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় আসেনি, তারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে।
বর্তমানে সিলেট বিভাগের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে মোট ২৬১ জন সন্দেহজনক হাম রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। নতুন ভর্তি হওয়া রোগীদের কারণে হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপও বেড়েছে।
মৃত্যুর পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিভাগের চার জেলাতেই প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। জেলাভিত্তিক মৃত্যুর চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো—
| জেলা |
মোট মৃত্যু |
| সিলেট |
২৯ |
| সুনামগঞ্জ |
৩১ |
| মৌলভীবাজার |
১০ |
| হবিগঞ্জ |
৬ |
| মোট |
৭৬ |
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত সিলেট বিভাগে সন্দেহজনক হামে ৭২ জন এবং পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া হামে ৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। সব মিলিয়ে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৬ জনে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, হাম প্রতিরোধে শিশুদের সময়মতো টিকাদান নিশ্চিত করা, আক্রান্ত ব্যক্তিকে দ্রুত শনাক্ত করা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা প্রদান অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে অভিভাবকদের শিশুদের জ্বর, শরীরে লালচে ফুসকুড়ি, কাশি, সর্দি বা শ্বাসকষ্টের মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
ক্রমবর্ধমান আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা ইঙ্গিত করছে যে সিলেট বিভাগে হাম পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। তাই স্বাস্থ্য বিভাগ সংক্রমণ প্রতিরোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং টিকাদান কার্যক্রম জোরদারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।