খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 8শে বৈশাখ ১৪৩২ | ২১ই এপ্রিল ২০২৫ | 1149 Dhu al-Hijjah 5
বাইরের আকাশে তখনো সূর্য ডুবেনি, কিন্তু চান্দিকা হাথুরুসিংহের ভেতরের আকাশে নেমে এসেছিল ঘোর অন্ধকার। অক্টোবরের এক দুপুরে তিনি টের পান—কেবল কোচের চেয়ারে বসে থাকা নয়, এখন তার নিজের অস্তিত্বই হুমকির মুখে।
বাংলাদেশ ক্রিকেটের সঙ্গে দীর্ঘ টানাপোড়েনের অধ্যায় তখন গুটিয়ে আসছে। কিন্তু গুটিয়ে আসার সেই মুহূর্তগুলো এতটা শ্বাসরুদ্ধকর হবে, সেটা হয়তো কল্পনাও করেননি তিনি।
রাজনৈতিক অস্থিরতার ঢেউ এসে লেগেছিল দেশের ক্রিকেট বোর্ডেও। বদলে গেছে নেতৃত্ব, বদল এসেছে অবস্থানে। আর সেই বদলের প্রথম শিকার—হাথুরুসিংহে।
স্পিনার নাসুম আহমেদকে হেনস্তার অভিযোগ, বোর্ডের চুক্তির শর্ত ভঙ্গ, ‘কারণ দর্শানো’ নোটিশ, আর একদিনের মধ্যেই দেওয়া ‘অগ্রহণযোগ্য’ জবাব—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এতটাই টালমাটাল হয়ে পড়ে যে, কোচের চেয়ারে আর টিকতে পারেননি তিনি।
কিন্তু সবচেয়ে ভয়াবহ মুহূর্তটি আসে বোর্ড সভাপতির সিদ্ধান্তের পর। তিনি বলেন, বিসিবির সিইও নিজামউদ্দিন চৌধুরী তাকে ব্যক্তিগতভাবে সতর্ক করে বলেছিলেন, ‘আপনার যাওয়া উচিত, আপনি কি টিকিটের ব্যবস্থা করেছেন?’ এ কথা শোনার পরই বুঝে যান, কিছু একটা ঠিকঠাক নেই।
সেদিন, সাধারণত তার সঙ্গে থাকা সশস্ত্র নিরাপত্তারক্ষীও ছিলেন না—শুধু এসেছিলেন ড্রাইভার। ব্যাংকে টাকা তুলতে গিয়ে তিনি টিভির স্ক্রলে দেখতে পান—‘চাকরিচ্যুত কোচ চান্দিকা হাথুরুসিংহে’, সঙ্গে হেনস্তার অভিযোগের ঢেউ।
ব্যাংক ব্যবস্থাপক নিচু স্বরে বলেন,‘কোচ, আপনি রাস্তায় নিরাপদ নন। আমি আপনাকে নিজে বাড়ি পৌঁছে দিচ্ছি।’
এইবার সত্যিকারের ভয় তার হাড়ে হাড়ে ঢুকে যায়। রাজনৈতিক পরিস্থিতির ভয়াবহতা তখন চরমে। তিনি শুনেছিলেন, সাবেক সরকারের একজন মন্ত্রীকেও রানওয়ে থেকে সরিয়ে আনা হয়েছিল গ্রেপ্তারের জন্য। ‘আমারও যদি ঠিক সেইভাবে থামানো হয়?’-এই ভয় নিয়েই তিনি সিদ্ধান্ত নেন দেশ ছাড়ার।
রাত গভীর হলে, চুপচাপ একটা হুডি মাথায় তুলে, চোখে পড়ে ক্যাপ, পা বাড়ান বিমানবন্দরের দিকে। কোনো আনুষ্ঠানিক বিদায় নেই, নেই বোর্ডের পক্ষ থেকে প্রতিনিধি।
তবে এক বিমানবাহিনীর কর্মকর্তা কাছে এসে বলেন-‘আমি দুঃখিত কোচ, আপনি আমাদের দেশের জন্য অনেক কিছু করেছেন।’ এই কথাটাই তাকে সবচেয়ে বেশি নাড়িয়ে দিয়েছিল।
এই দৃশ্য যেন কোনো থ্রিলার ফিল্মের শেষ দৃশ্য—হলুদ আলো মাখা রানওয়ে, ধীরে এগিয়ে যাওয়া বিমান, আর তাতে একজন ‘পলাতক’ কোচ, যিনি আসলে পালাচ্ছেন আতঙ্ক থেকে, সংশয় থেকে, আর হয়তো কিছুটা নিজেরই ছায়া থেকে।
তবে বাস্তবতার খাতায় ভিন্ন এক পৃষ্ঠা লেখা আছে। বাংলাদেশের সেই সময়কার রাজনৈতিক বাস্তবতা, কিংবা ক্রিকেটপ্রেমীদের মনোভাব—কোনোটিই এতটা উত্তপ্ত ছিল না, যতটা হাথুরুসিংহের বর্ণনায় উঠে এসেছে। এক পক্ষ যেমন তার বিদায় চেয়েছিল, অন্য পক্ষ ঠিক ততটাই চেয়েছিল তাকে রেখে দেওয়ার পক্ষেও।
খবরওয়ালা/টিএ