খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারি ২০২৬
বাংলাদেশের বর্তমান কর কাঠামো সংস্কারের মাধ্যমে আগামী ২০৩৫ সালের মধ্যে কর-জিডিপি অনুপাত ১৫ থেকে ২০ শতাংশে উন্নীত করার এক উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা ও সুপারিশ প্রস্তাব করেছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই)। বর্তমানে এই অনুপাত মাত্র ৮-৯ শতাংশের ঘরে থাকলেও কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে এটি ৬ শতাংশের নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। মূলত প্রত্যক্ষ করের হার বাড়ানো এবং পরোক্ষ করের ওপর নির্ভরতা কমানোর মাধ্যমেই এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর বনানীতে পিআরআই কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ‘উন্নয়নের জন্য করনীতি: কর ব্যবস্থা পুনর্গঠনের সংস্কার কর্মসূচি’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। প্রতিবেদনটি ইতোমধ্যে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরে জমা দেওয়া হয়েছে। টাস্কফোর্সের প্রধান এবং পিআরআই চেয়ারম্যান ড. জাইদি সাত্তার সংবাদ সম্মেলনে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন। তিনি জানান, বিদ্যমান কর ব্যবস্থা অত্যন্ত জটিল এবং এটি পরোক্ষ করের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল, যা অর্থনীতিতে বৈষম্য সৃষ্টি করছে।
প্রতিবেদনে প্রস্তাব করা হয়েছে যে, বর্তমানের ৭০:৩০ পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ করের অনুপাতকে ধাপে ধাপে ৫০:৫০ অনুপাতে নিয়ে আসতে হবে। অর্থাৎ, মানুষের আয়ের ওপর কর (সরাসরি কর) বাড়িয়ে আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাতে হবে।
টেবিল: ২০৩৫ সালের জন্য প্রস্তাবিত কর কাঠামোর লক্ষ্যমাত্রা
| সূচক | বর্তমান অবস্থা | ২০৩৫ সালের লক্ষ্যমাত্রা |
| কর-জিডিপি অনুপাত | প্রায় ৮-৯% | ১৫% – ২০% |
| জিডিপিতে প্রত্যক্ষ করের অবদান | ২.৫% | ৯% – ১০% |
| শুল্কের অবদান (মোট রাজস্বে) | ২৮% | ৭.৫% |
| জিডিপিতে শুল্কের অবদান | ২.৫% | ১.০% |
| পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ করের অনুপাত | ৭০ : ৩০ | ৫০ : ৫০ |
পিআরআই-এর এই প্রতিবেদনে রাজস্ব প্রশাসনের তিনটি প্রধান খাত—সরাসরি কর, মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ও শুল্ক সংক্রান্ত মোট ৫৫টি অগ্রাধিকার বিষয় চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে সরাসরি কর খাতে ৩২টি, ভ্যাটে ১০টি এবং বাণিজ্য কর বা শুল্ক খাতে ১৩টি নীতিগত পরিবর্তনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
ড. জাইদি সাত্তার বলেন, উচ্চ আমদানি শুল্কের কারণে স্থানীয় বাজারে পণ্য বিক্রি করা রপ্তানির চেয়ে বেশি লাভজনক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে পোশাক খাত ছাড়া অন্য কোনো শক্তিশালী রপ্তানি খাত গড়ে উঠছে না। এলডিসি উত্তরণের পর বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে এই সুরক্ষা দেয়াল বা ট্যারিফ কমিয়ে আনা জরুরি।
ভ্যাট সংস্কারের বিষয়ে কৃষি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন জানান, বর্তমানে বাংলাদেশে সাত থেকে আটটি ভিন্ন ভিন্ন ভ্যাট হার প্রচলিত রয়েছে, যা বিভ্রান্তি তৈরি করে। লক্ষ্য হওয়া উচিত একক ভ্যাট হার বাস্তবায়ন করা, তবে প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে অন্তত দুটি নির্দিষ্ট হারে ভ্যাট নির্ধারণ করা যেতে পারে।
অন্যদিকে, করপোরেট কর ও ব্যক্তিগত আয়কর নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়েছে। পরামর্শ দেওয়া হয়েছে যে, প্রত্যক্ষ করের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যক্তিগত আয়করের আওতা বাড়ানো এবং সম্পদ স্থানান্তরের করহার ৫০ শতাংশ হ্রাস করা প্রয়োজন। এছাড়া, রিটার্ন জমা না দেওয়ার ক্ষেত্রে বিদ্যমান জরিমানার বিধান কঠোরভাবে কার্যকর করার জন্য একটি শক্তিশালী ডিজিটাল তথ্যভান্ডার বা ডেটাবেজ গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
বক্তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যদি কর ব্যবস্থায় দ্রুত আমূল পরিবর্তন না আনা হয়, তবে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের অর্থায়ন এবং ক্রমবর্ধমান বৈদেশিক ঋণের দায় মেটানো সরকারের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে। তাই ২০৩৫ সালের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কেবল রাজস্ব বৃদ্ধির জন্য নয়, বরং টেকসই অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্যও অপরিহার্য।