খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 18শে চৈত্র ১৪৩২ | ১ই এপ্রিল ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
মেক্সিকোর গুয়াদালুপ স্টেডিয়ামে তখন গোধূলির আলো। রেফারি যখন শেষ বাঁশিটি বাজালেন, গ্যালারিতে উপস্থিত হাজারো ইরাকি সমর্থক আর মাঠের ফুটবলারদের আবেগের বাঁধ ভেঙে গেল। একদিকে ৪ দশক পর বিশ্বমঞ্চে ফেরার অদম্য আনন্দ, অন্যদিকে স্বপ্নভঙ্গের বিষাদে স্তব্ধ বলিভিয়া। পোস্টের নিচে বসে বলিভিয়ান গোলরক্ষক গিলের্মো ভিসকারার অঝোর কান্না দেখে যে কেউ থমকে যেতে পারতেন, কিন্তু ফুটবলের নিষ্ঠুর সত্য এই যে—একপক্ষের অশ্রু অন্যপক্ষের জন্য নিয়ে আসে গৌরবের মুকুট।
বিশ্বকাপের আন্তমহাদেশীয় প্লে–অফ ফাইনালে আজ মুখোমুখি হয়েছিল এশিয়ার প্রতিনিধি ইরাক এবং দক্ষিণ আমেরিকার লড়াকু দল বলিভিয়া। ম্যাচের শুরু থেকেই দুই দলের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই পরিলক্ষিত হয়। বল দখল এবং আক্রমণে লাতিন আমেরিকার দেশটি কিছুটা এগিয়ে থাকলেও মাঠের কৌশলে এবং ফিনিশিংয়ে আজ শ্রেষ্ঠত্ব দেখিয়েছে ইরাক।
ম্যাচের ধারাক্রম ছিল এক কথায় রোমাঞ্চকর:
শুরুর আক্রমণ: ৯ মিনিটে বক্সের ঠিক বাইরে ফ্রি-কিক পায় ইরাক। আল-আমারির সেই শক্তিশালী শটটি অবিশ্বাস্য দক্ষতায় ফিরিয়ে দেন বলিভিয়ান গোলরক্ষক ভিসকারা।
প্রথম সাফল্য: তবে সেই স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। পরবর্তী মিনিটেই আল-আমারির নেওয়া কর্নার থেকে দুর্দান্ত এক হেডে বল জালে জড়ান আল-হামাদি। ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় ইরাক।
বলিভিয়ার প্রতাবর্তন: পিছিয়ে পড়ে বলিভিয়া যেন ক্ষিপ্র হয়ে ওঠে। ৩৮ মিনিটে মইসেস পানিয়াগুয়া অসাধারণ এক গোল করে দলকে সমতায় ফেরান। প্রথমার্ধ শেষ হয় ১-১ সমতায়।
দ্বিতীয়ার্ধে দুই দলই সতর্ক হয়ে পড়ে। ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিতে যখন উভয় পক্ষ লড়াই করছিল, ঠিক তখন ইরাকের কোচ বদলি খেলোয়াড় হিসেবে মার্কো ফারজিকে মাঠে নামান। ম্যাচের ভাগ্য বদলে যায় ফারজির এক সুনিপুণ পাসে। বক্সের ভেতর বল পেয়ে নিখুঁত ফিনিশিংয়ে ইরাককে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে দেন দলের তারকা স্ট্রাইকার আইমেন হুসেইন।
খেলার শেষ কয়েক মিনিটে বলিভিয়া মরিয়া হয়ে একের পর এক আক্রমণ চালিয়ে ইরাকি রক্ষণভাগকে তছনছ করে দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু ইরাকের রক্ষণ দেওয়াল ছিল অভেদ্য। ২-১ গোলের এই জয়ের ফলে ৪৮তম এবং সর্বশেষ দল হিসেবে আগামী বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করল ইরাক।
| বিবরণ | ইরাক | বলিভিয়া |
| গোল সংখ্যা | ২ | ১ |
| বল দখল (%) | ৪৫% | ৫৫% |
| মোট শট (Target) | ১০ (৬) | ১২ (৫) |
| কর্নার কিক | ৫ | ৭ |
| ফাউল | ১২ | ১৪ |
| হলুদ কার্ড | ২ | ৩ |
| চূড়ান্ত ফলাফল | জয়ী (বিশ্বকাপে উত্তীর্ণ) | পরাজিত |
ইরাকের জন্য এই জয় কেবল একটি ম্যাচের জয় নয়, বরং এটি দীর্ঘ ৪০ বছরের আক্ষেপ ঘুচানোর মুহূর্ত। সর্বশেষ ১৯৮৬ সালে মেক্সিকো বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছিল দেশটি। দীর্ঘ সময় পর সেই মেক্সিকোর মাটিতেই আবার বিশ্বমঞ্চে ফেরার টিকিট পেল তারা। যুদ্ধের ক্ষত আর রাজনৈতিক অস্থিরতা কাটিয়ে ফুটবলের এই সাফল্য ইরাকি জনগণের জন্য এনে দিয়েছে এক পশলা শান্তির বাতাস।
এই অর্জনের মাধ্যমে ইরাক প্রমাণ করল যে, ধৈর্য এবং একাগ্রতা থাকলে যেকোনো বাধা অতিক্রম করা সম্ভব। ১৯৮৬ থেকে ২০২৬—মাঝখানের এই চারটি দশক যেন আজ এক নিমিষেই মুছে গেল গ্যালারির আনন্দাশ্রুর বন্যায়। এখন বিশ্বের ফুটবল প্রেমীদের অপেক্ষা, বিশ্বমঞ্চে এশিয়ার এই ‘সিংহের দল’ কতটা গর্জন দিতে পারে তা দেখার।