খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৬
বাংলা সাহিত্যের এক নীরব অথচ গভীর প্রভাবশালী নাম মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। ১৯৩৮ সালের ২৫ এপ্রিল সিলেটে তাঁর জন্ম। জীবনের দীর্ঘ পরিক্রমায় তিনি ছিলেন এক বহুমাত্রিক সৃজনশীল ব্যক্তিত্ব— কবি, কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক এবং বিশেষভাবে একজন অনন্য অনুবাদক।
শৈশব ও শিক্ষাজীবন থেকেই তিনি জ্ঞানচর্চার প্রতি গভীর অনুরাগী ছিলেন। তুলনামূলক সাহিত্য, ভারতীয় নন্দনতত্ত্ব এবং ললিতকলার ইতিহাস বিষয়ে তাঁর আগ্রহ তাঁকে এক বিস্তৃত বৌদ্ধিক পরিসরে নিয়ে যায়। এই জ্ঞানচর্চা তাঁর সাহিত্যকর্ম ও অনুবাদের ভিতকে আরও দৃঢ় ও সমৃদ্ধ করে তোলে।
শিক্ষকতা জীবনের সূচনা তিনি মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুনে করেন। পরবর্তীতে তিনি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগে অধ্যাপনায় যুক্ত হন এবং সেখানে দীর্ঘ সময় ধরে শিক্ষার্থীদের সাহিত্য ও মননের গভীর জগতে পথ দেখান। তাঁর পাঠদান কেবল পাঠ্যবইনির্ভর ছিল না, বরং সাহিত্যকে জীবনের সঙ্গে যুক্ত করার এক বৌদ্ধিক অনুশীলন ছিল।
তবে তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান অনুবাদের ক্ষেত্রে। মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলা পাঠকদের জন্য এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন। তাঁর হাত ধরেই বাংলা ভাষায় প্রথম ব্যাপকভাবে প্রবেশ করে লাতিন আমেরিকার সাহিত্যজগৎ। ম্যাজিক রিয়েলিজমের বিস্ময়কর ও কল্পনাময় জগৎ বাংলার পাঠকদের কাছে পৌঁছে দেন তিনি।
গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস ১৯৮২ সালে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার বহু আগেই, ১৯৭০ সাল থেকে তাঁর রচনাগুলো বাংলায় অনুবাদ করতে শুরু করেন মানবেন্দ্র। তিনি অনুবাদ করেন “কর্নেলকে কেউ চিঠি লেখে না”, “সারলা এরেন্দিরা”সহ বহু গুরুত্বপূর্ণ রচনা এবং মার্কেসের নোবেল ভাষণও। পাশাপাশি তিনি কার্লোস ফুয়েন্তেসসহ লাতিন আমেরিকার আরও বহু গুরুত্বপূর্ণ লেখকের সাহিত্য বাংলাভাষী পাঠকের কাছে পৌঁছে দেন।
তাঁর অনুবাদ শুধু ভাষান্তর ছিল না, বরং এক সংস্কৃতিগত সেতুবন্ধন, যা বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে যুক্ত করেছে। তাঁর কাজের মাধ্যমে বাংলা গদ্য নতুন অভিব্যক্তি ও শৈল্পিক মাত্রা লাভ করে।
২০২০ সালের ৪ আগস্ট করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তবে তাঁর সৃষ্ট অনুবাদের ভুবন, সাহিত্যচিন্তা ও বৌদ্ধিক উত্তরাধিকার আজও বাংলা সাহিত্যের পাঠক ও গবেষকদের কাছে অমূল্য সম্পদ হয়ে রয়েছে।