খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 12শে বৈশাখ ১৪৩৩ | ২৫ই এপ্রিল ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
যুক্তরাজ্যের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে জাতীয় সুরক্ষা এবং সামরিক সেবায় অংশগ্রহণের বিষয়ে এক চরম অনীহা ও নেতিবাচক মনোভাব পরিলক্ষিত হয়েছে। সম্প্রতি দ্য টেলিগ্রাফ-এ প্রকাশিত এক জনমত জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে, দেশটির সিংহভাগ তরুণ এখন আর রাষ্ট্রের প্রয়োজনে অস্ত্র ধরতে ইচ্ছুক নন। গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ের জন স্মিথ সেন্টার কর্তৃক পরিচালিত এই জরিপটি যুক্তরাজ্যের ১৬ থেকে ২৯ বছর বয়সী ২,০০০ তরুণের মতামতের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে।
জরিপের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যের তরুণদের অর্ধেকেরও বেশি (৫১ শতাংশের অধিক) সরাসরি জানিয়েছেন যে, দেশ আক্রান্ত হলেও বা কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে তারা সামরিক বাহিনীতে যোগ দিয়ে যুদ্ধ করতে রাজি নন। মাত্র ৩৮ শতাংশ অংশগ্রহণকারী জানিয়েছেন যে, তারা নির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতিতে দেশের জন্য লড়াই করার কথা বিবেচনা করতে পারেন। এই পরিসংখ্যানটি ব্রিটেনের দীর্ঘমেয়াদী প্রতিরক্ষা নীতি এবং জাতীয় সংহতির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নিচে জরিপ থেকে প্রাপ্ত কিছু গুরুত্বপূর্ণ তুলনামূলক তথ্য টেবিল আকারে উপস্থাপন করা হলো:
| সূচক | বর্তমান পরিস্থিতি (২০২৬ পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য) | পূর্ববর্তী বছরের তুলনামূলক চিত্র |
| যুদ্ধে অংশগ্রহণে ইচ্ছুক তরুণ | ৩৮% | তথ্য নেই (হ্রাসমান) |
| যুদ্ধে অংশগ্রহণে সরাসরি অনীহা | ৫০% এর অধিক | বৃদ্ধি পেয়েছে |
| জীবনযাত্রার উন্নতি নিয়ে আশাবাদ | ৩৬% | ৬৩% (গত বছর) |
| রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থা | ২৫% | নিম্নমুখী |
| গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা নিয়ে সন্তুষ্টি | সংখ্যালঘু অংশ | অধিকাংশেরই সংশয় |
জন স্মিথ সেন্টারের পরিচালক এডি বার্নস এই পরিস্থিতির বিশদ ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন। তার মতে, তরুণদের এই অনাগ্রহের মূলে রয়েছে রাষ্ট্রের প্রতি তাদের ক্রমবর্ধমান অবিশ্বাস এবং অর্থনৈতিক বঞ্চনা। তরুণরা মনে করছেন, রাষ্ট্র যখন তাদের মৌলিক অধিকার ও ভবিষ্যতের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে, তখন রাষ্ট্রের জন্য জীবন উৎসর্গ করার প্রেরণা তারা খুঁজে পাচ্ছেন না। এই অনীহার পেছনে প্রধান কারণগুলো হলো:
আবাসন সংকট: যুক্তরাজ্যে আবাসন ব্যয় আকাশচুম্বী হওয়ায় তরুণদের একটি বড় অংশ নিজেদের বাড়ি কেনা বা স্বাধীনভাবে থাকার সক্ষমতা হারাচ্ছেন।
নিম্ন মজুরি ও ঋণের বোঝা: উচ্চশিক্ষার ব্যয় নির্বাহ করতে গিয়ে শিক্ষার্থীরা বিশাল ঋণের জালে আবদ্ধ হচ্ছেন, কিন্তু কর্মক্ষেত্রে সেই অনুপাতে মজুরি বৃদ্ধি পাচ্ছে না।
প্রযুক্তিগত ঝুঁকি: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI-এর দ্রুত প্রসারের ফলে ভবিষ্যতে কর্মসংস্থান হারানোর ভয় তরুণদের মধ্যে তীব্র অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
রাজনৈতিক বিমুখতা: মাত্র ২৫ শতাংশ তরুণ মনে করেন যে বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থা তাদের প্রতি ন্যায্য আচরণ করে। অধিকাংশেরই ধারণা, ব্রিটিশ রাজনীতি বর্তমানে চরমভাবে বিভক্ত এবং সাধারণ মানুষের চাহিদার চেয়ে দলীয় স্বার্থকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে।
জরিপটির সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর দিক হলো তরুণদের জীবন নিয়ে আশাবাদ নাটকীয়ভাবে হ্রাস পাওয়া। গত এক বছরে এই হার ৬৩ শতাংশ থেকে কমে মাত্র ৩৬ শতাংশে নেমে এসেছে। তরুণরা মনে করছেন, তাদের জীবনমান তাদের বাবা-মায়ের প্রজন্মের চেয়েও খারাপ হবে। উচ্চতর ডিগ্রি থাকা সত্ত্বেও প্রতিযোগিতামূলক চাকরির বাজারে তারা টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছেন এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরও আর্থিক প্রয়োজনে বাবা-মায়ের ওপর নির্ভরশীল থাকতে হচ্ছে।
এই সামগ্রিক অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা তরুণদের জাতীয়তাবোধকে শিথিল করে দিয়েছে। তাদের মতে, যে সামাজিক কাঠামো তাদের অবসরের নিশ্চয়তা বা ন্যূনতম জীবনযাত্রার মান দিতে পারছে না, সেই কাঠামো রক্ষা করার জন্য যুদ্ধে যাওয়া তাদের কাছে অযৌক্তিক মনে হচ্ছে। মূলত রাজনৈতিক অঙ্গনের অস্থিরতা এবং অর্থনৈতিক সংকটই ব্রিটিশ তরুণদের জাতীয় দায়বদ্ধতা থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।