খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিখ্যাত দর্শন ছিল ‘দারিদ্র্যকে জাদুঘরে পাঠানো’। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে তার দায়িত্ব পালনের সময় বাস্তবতা ভিন্ন ছিল। ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রায় ১৮ মাসের মধ্যে দেশের ৩০ লাখের বেশি মানুষ নতুন করে দরিদ্র তালিকায় যুক্ত হয়েছেন।
ড. ইউনূস দায়িত্ব নেওয়ার সময় বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা চরমে, জনগণ স্বৈরাচার ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন চালাচ্ছিল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তার হাতে ছিল দেশকে অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতার পথে ফিরিয়ে আনার বিরল সুযোগ। তিনি নিজের পছন্দমতো উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারী নিয়োগ দিয়ে শক্তিশালী প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি করতে পারতেন। এছাড়া বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি এবং ছাত্র-জনতার সমর্থন থাকায় রাজনৈতিক বাধা ছিল কম।
তবে তার শাসনামলে অর্থনীতি বিপর্যস্ত অবস্থায় পড়ে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি প্রফেসর প্রফেসর আবদুল বায়েস বলেন, ‘প্রবাসী আয় ও রিজার্ভ বৃদ্ধি ছাড়া অর্থনীতির সব সূচকই নিম্নমুখী ছিল। শিল্প উৎপাদন ও বিনিয়োগ কমে গেছে, বেকারত্ব ও দরিদ্রতার হার বেড়েছে।’
নিম্নের টেবিলে প্রধান অর্থনৈতিক সূচকের বিবরণ দেখানো হলো:
| সূচক | ২০২৪ সালের জুন | ২০২৫ সালের জুন | পরিবর্তন |
|---|---|---|---|
| বেসরকারি বিনিয়োগ (% জিডিপি) | ২৪.০ | ২২.৪৮ | -১.৫২ পয়েন্ট |
| বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন (%) | ১১.৫ | ১১.৫ | ন্যূনতম |
| ব্যাংকের খেলাপি ঋণ (%) | ২০.২ | ৩৫.৭৩ | +১৫.৫১ পয়েন্ট |
| সরকারি ঋণের পরিমাণ (টাকা কোটি) | ২২,৫০,৯০৪ | ২৩,২৪,০০৫ | +৭৩,১০১ |
বিদেশি রিজার্ভ বৃদ্ধি পেয়েছে ৩৪ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি বড় জোর ‘উপকরণ’, লক্ষ্য হওয়া উচিত উৎপাদনক্ষমতা, কর্মসংস্থান, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা, এবং নীতিগত স্বাধীনতা। রিজার্ভ বৃদ্ধি করতে শিল্প ও জনজীবনে চাপ সৃষ্টি হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে প্রভাবিত করেছে।
ড. ইউনূস দায়িত্ব নেওয়ার সময় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন গণতন্ত্র, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, দুর্নীতি দমন ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে। কিন্তু তার আমলে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। গ্রামীণ ব্যাংকের কর ছাড়, গ্রামীণ গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশেষ সুবিধা এবং শ্রম আইন লঙ্ঘনের বিষয়গুলোও প্রকাশ্যে এসেছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদন ও আমদানি সীমিত করে, শিল্প খাতকে চাপের মধ্যে রাখার মাধ্যমে রিজার্ভ বৃদ্ধির দিকে মনোনিবেশ করা হলেও দরিদ্রতা ও বেকারত্ব কমানো সম্ভব হয়নি। তার ‘তিন শূন্য’ (শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব, শূন্য কার্বন নিংসরণ) নীতির প্রতিফলন বাস্তব জীবনে দেখা যায়নি।
সচেতন মহল এখন প্রশ্ন করছে: বিদায় নেওয়ার পরও ড. ইউনূস কি আবার এই ‘তিন শূন্য’ অর্জনের লক্ষ্যে বিশ্বকে প্রেরণা দিতে পারবেন? তার শাসনামলের পাঠ এবং ভুল থেকে ভবিষ্যৎ নীতি নির্ধারকদের শিক্ষা নেওয়াই এখন সময়োপযোগী চ্যালেঞ্জ।