খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
২০২৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মেহেরপুর জেলার দুটি আসনেই এক অভাবনীয় রাজনৈতিক সমীকরণ দৃশ্যমান হয়েছে। দীর্ঘদিনের প্রভাবশালী রাজনৈতিক শক্তি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-কে পরাজিত করে মেহেরপুর-১ ও মেহেরপুর-২ আসনে বিশাল বিজয় ছিনিয়ে নিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। মেহেরপুর-১ আসনে বর্ষীয়ান নেতা মাসুদ অরুণ এবং মেহেরপুর-২ আসনে আমজাদ হোসেনের এই পরাজয় কেবল একটি আসনের হাতবদল নয়, বরং এটি জেলার সামগ্রিক সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক গভীর পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করছে।
মেহেরপুরের নির্বাচনী পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিগত বছরগুলোর তুলনায় জামায়াতের জনসমর্থন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে, বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল তাদের ভোট ব্যাংকে বড় ধরনের ধস নামিয়েছে।
মেহেরপুর জেলার নির্বাচনী ফলাফল একনজরে:
| আসন | বিজয়ী প্রার্থী (দল) | প্রাপ্ত ভোট | নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী (দল) | প্রাপ্ত ভোট |
| মেহেরপুর-১ | মাওলানা তাজউদ্দিন খান (জামায়াত) | ১,২১,৪৬১ | মাসুদ অরুণ (বিএনপি) | ১,০৪,৭৮৭ |
| মেহেরপুর-২ | মো. নাজমুল হুদা (জামায়াত) | ৯৬,৩০৬ | মো. আমজাদ হোসেন (বিএনপি) | ৮৫,৯৮৮ |
মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধান এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির এই বিপর্যয়ের পেছনে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট কারণ রয়েছে:
১. তৃণমূলের বিশৃঙ্খলা ও আধিপত্য বিস্তার: ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে মেহেরপুরের বিভিন্ন এলাকায় বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হাট-বাজার, খাল-বিল দখল এবং মামলার ভয় দেখিয়ে আর্থিক সুবিধা গ্রহণের অভিযোগ ওঠে। সাধারণ মানুষের মধ্যে ‘ক্ষমতার পরবর্তী প্রভাব’ নিয়ে এক ধরনের ভীতি তৈরি হয়, যার প্রতিফলন ঘটেছে ব্যালটে।
২. ভয়াবহ অভ্যন্তরীণ কোন্দল: মেহেরপুর-১ আসনে মাসুদ অরুণ বনাম কামরুল হাসান এবং মেহেরপুর-২ আসনে জেলা সভাপতি জাভেদ মাসুদ মিল্টন বনাম আমজাদ হোসেনের মধ্যকার বিরোধ প্রকাশ্য রূপ নেয়। বিশেষ করে মেহেরপুর-১ আসনের একটি কল রেকর্ড সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়, যেখানে দলীয় নেতা কামরুল হাসানকে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানাতে শোনা যায়।
৩. প্রান্তিক নেতাদের অবাধ্য আচরণ: দলের শীর্ষ নেতৃত্ব তৃণমূলের নেতাদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্যর্থ হয়েছেন। ত্যাগী কর্মীদের অবমূল্যায়ন এবং ‘কমিটি বাণিজ্য’-এর অভিযোগ সাধারণ ভোটারদের পাশাপাশি খোদ দলের সমর্থকদেরও হতাশ করেছে।
বিএনপি যখন অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে লিপ্ত, জামায়াতে ইসলামী তখন অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে তাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। তারা বিশাল শোডাউনের বদলে ‘ডোর-টু-ডোর’ বা ঘরে ঘরে গিয়ে জনসংযোগ করার নীতি গ্রহণ করে। মসজিদভিত্তিক যোগাযোগ, অসহায়দের চিকিৎসা সহায়তা এবং শিক্ষাসামগ্রী বিতরণের মাধ্যমে তারা সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি আস্থার জায়গা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে।
এবারের নির্বাচনে মেহেরপুরের কেন্দ্রগুলোতে নারী ভোটারদের ব্যাপক উপস্থিতি ছিল দেখার মতো। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সামাজিক স্থিতি ও পারিবারিক নিরাপত্তার প্রশ্নে নারী ভোটাররা জামায়াতকে ‘কম ঝুঁকিপূর্ণ’ বিকল্প হিসেবে বেছে নিয়েছেন। যারা অতীতে রাজনৈতিক সহিংসতার ভয়ে কেন্দ্রে যেতেন না, তারা এবার নিরবে ভোট দিয়ে এক ধরনের ‘ভোট বিপ্লব’ ঘটিয়েছেন।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, মেহেরপুরের এই ফলাফল বিএনপির জন্য একটি কঠিন সতর্কবার্তা এবং আত্মসমালোচনার সময়। ক্ষমতার স্বাদ পাওয়ার আগেই নেতাকর্মীদের ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ সাধারণ ভোটারদের বিমুখ করেছে। অন্যদিকে, জামায়াতের জন্য এটি অর্জিত আস্থা ধরে রাখার বড় পরীক্ষা। মেহেরপুরে এবার ভোট ছিল নীরব, কিন্তু ব্যালটের মাধ্যমে দেওয়া জনগণের রায় ছিল অত্যন্ত উচ্চকণ্ঠ এবং তাৎপর্যপূর্ণ।