খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের সকল বড় শহর এবং গ্রামে মশার তাণ্ডব এখন দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজধানীর তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ডে চায়ের দোকান চালানো বিল্লাল হোসেন বললেন, “দু’দিকের কয়েল জ্বালালেও মশা নিস্তব্ধ হয় না। দিনরাত মশার উৎপাত আমাদের থামিয়ে দেয়। কখন কেমন কামড়াবে– সেই চিন্তায় বারবার ছটফট করতে হয়।”
পীরেরবাগ রোডের রোকেয়া সরণির বাসিন্দা বাদল সূত্রধর আরও বলেন, “এত মশা জীবনে দেখিনি। শরীরে কামড় লেগে চুলকানি হয়। দোকানে মশা নিয়ন্ত্রণের সামগ্রী নেই। ঘরে কয়েল জ্বালানোও নিরাপদ মনে হয় না।”
রাজধানীর এই সমস্যার মাত্রা শুধু ঢাকা নগরী পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়; দেশের সব সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও গ্রামে মশার তাণ্ডব ছড়িয়ে পড়েছে।
সম্প্রতি একজন আইনজীবী স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে আইনি নোটিশ পাঠান। এক মাসের বেশি সময়েও মশার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। মাঝে মধ্যে ওষুধ ছিটালেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল এবং কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমডোর মো. মাহবুবুর রহমান তালুকদার জানান, “মশার ওষুধ কার্যকর কিনা তা যাচাই করতে আমরা নমুনা সংগ্রহ করি এবং তা আইইডিসিআর-এ পাঠাই। আশা করি পরীক্ষার ফলাফল অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।”
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার বলেন, “বেশ কিছুদিন বৃষ্টি না হওয়ায় ড্রেন ও জলাধারগুলোতে পানি জমে গেছে। পচা পানি এবং উষ্ণ আবহাওয়া মশার প্রজননের জন্য আদর্শ পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। সিটি করপোরেশন যদি নিয়মিত মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম চালাত, এই ভয়াবহ পরিস্থিতি হতো না।”
নিম্নলিখিত টেবিলে বিভিন্ন শহরে মশা ও মশাবাহিত রোগের পরিস্থিতি তুলে ধরা হলো:
| শহর | মশাবাহিত রোগ | আক্রান্ত সংখ্যা | মৃত্যুর সংখ্যা | নোটিসযোগ্য মন্তব্য |
|---|---|---|---|---|
| চট্টগ্রাম | ডেঙ্গু | ৬,৩৩৮ | ৪৮ | লার্ভার ঘনত্ব বেড়ে ৭৫.২৯% |
| চট্টগ্রাম | চিকুনগুনিয়া | ৩,৬৮৩ | – | কার্যকর ব্যবস্থা কম |
| রাজশাহী | ডেঙ্গু | ১,৭২০ | ২১ | ফগার মেশিন ও ওষুধের অভাব |
| খুলনা | ডেঙ্গু | ৪৫ | – | ফার্নেস অয়েল মজুত নেই |
| সিলেট | ডেঙ্গু | ২ | – | কর্মী সংকট ও ফগার মেশিন সীমিত |
| রংপুর | – | – | – | ওষুধ কার্যকর নয়, সরঞ্জাম কম |
| ময়মনসিংহ | – | – | – | সাঁড়াশি অভিযান চলছে, ফলাফল কম |
সিলেট: কর্মী সংকটের কারণে মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম সীমিত। এডিস লার্ভা পাওয়া গেছে, যা ডেঙ্গুর ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
খুলনা: ফার্নেস অয়েল ও অ্যাডাল্টিসাইডের সরবরাহ অনিয়মিত হওয়ায় মশার উপদ্রব বেড়েছে।
রংপুর: মশক নিধনের ওষুধ প্রয়োগ সীমিত, ফগার মেশিনের সংখ্যা কম।
ময়মনসিংহ: নিয়মিত সাঁড়াশি অভিযান চললেও মশা কমছে না।
বগুড়া ও কুমিল্লা: বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও কার্যকর কার্যক্রম দেখা যাচ্ছে না; অনেক এলাকায় মশা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, বর্ষার আগে মশার প্রজননক্ষেত্র ধ্বংস না করলে বিপদ আরও বাড়বে। সিটি করপোরেশন, উপজেলা পরিষদ এবং স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া নাগরিকরা রক্ষা পাবে না।
নাগরিকরা তাই এখন ঘরে-বাইরে মশার প্রতিরোধক ব্যবস্থার উপর নির্ভর করতে বাধ্য, আর প্রশাসনিক তৎপরতার ওপর পুরোপুরি ভরসা রাখা যাচ্ছে না।
রাজ্যের বিভিন্ন শহরে মশার দমনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং জনজীবনে ব্যাঘাত বহুমাত্রিক হতে পারে।