খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি আর নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন দাম সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর জন্য বর্তমান বাজার পরিস্থিতি এক কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) পরিচালিত ট্রাক সেল কর্মসূচি অনেকের কাছেই জীবনরক্ষাকারী ঢাল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ঢাকার রাজপথ থেকে শুরু করে অলিগলি—প্রতিটি টিসিবি ট্রাকের পেছনে এখন দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে ক্ষুধার্ত ও অসহায় মানুষের লাইন।
বর্তমানে একজন কার্ডধারী বা নিম্নআয়ের ক্রেতা টিসিবির ট্রাক থেকে একটি নির্দিষ্ট প্যাকেজে ৫টি পণ্য কিনতে পারেন। খোলা বাজারের তুলনায় টিসিবির পণ্যের দামের ব্যবধান এতটাই বেশি যে, একজন সাধারণ মানুষের পক্ষে এই লাইনে দাঁড়ানো ছাড়া আর কোনো বিকল্প থাকছে না। নিচের সারণিতে টিসিবির পণ্যের মূল্য ও বর্তমান বাজারের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হলো:
| পণ্যের নাম | টিসিবির মূল্য (প্রতি একক) | বাজার মূল্য (আনুমানিক) | সাশ্রয়ের পরিমাণ |
| সয়াবিন তেল (২ লিটার) | ১১৫ টাকা (লিটার) | ১৬৫-১৭০ টাকা (লিটার) | ১০০-১১০ টাকা |
| মসুর ডাল (২ কেজি) | ৭০ টাকা (কেজি) | ১৩০-১৪০ টাকা (কেজি) | ১২০-১৪০ টাকা |
| চিনি (১ কেজি) | ৮০ টাকা | ১৪০-১৫০ টাকা | ৬০-৭০ টাকা |
| ছোলা (১ কেজি) | ৬০ টাকা | ১১০-১২০ টাকা | ৫০-৬০ টাকা |
| খেজুর (৫০০ গ্রাম) | ৮০ টাকা | ২৫০-৩০০ টাকা (নিম্নমান) | ১৭০-২২০ টাকা |
| মোট প্যাকেজ (৫৫০ টাকা) | ব্যয়: ৫৫০ টাকা | ব্যয়: প্রায় ৯৫০ টাকা | সাশ্রয়: ৪০০ টাকা |
ঢাকার কাজীপাড়া মেট্রো স্টেশনের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাকটির পেছনে তাকালে দেখা যায় সমাজের প্রান্তিক মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই। সেখানে শারীরিক প্রতিবন্ধী নাসির খান তার অসুস্থ পা নিয়ে ক্রাচে ভর দিয়ে বসে আছেন। একসময় বর্জ্যবাহী ভ্যান চালালেও এখন তিনি কর্মহীন। স্ত্রী মাহিনুরের ৯ হাজার টাকার আয়ে দুই মেয়ের পড়ালেখা আর সংসার চালানো যখন অসম্ভব, তখন টিসিবির এই ৪০০ টাকার সাশ্রয়ই তাদের কাছে আশার আলো।
অন্যদিকে, ডাব বিক্রেতা শাকিল বা আগারগাঁওয়ের মিনুয়ারা বেগমের গল্পগুলো আরও করুণ। শাকিলকে তার আয়ের উৎস দোকান বন্ধ রেখে সাড়ে তিন ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে। মিনুয়ারা বেগমকে তার এক বছরের কোলের শিশুকে নিয়ে দীর্ঘক্ষণ রৌদ্রে অপেক্ষা করতে হয়েছে। এই দীর্ঘ প্রতীক্ষা কেবল পণ্যের জন্য নয়, বরং দারিদ্র্যের কশাঘাত থেকে কিছুটা মুক্তির জন্য।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, গত জানুয়ারিতে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৮ দশমিক ২৯ শতাংশে পৌঁছেছে। বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের প্রতিবেদন আরও ভয়াবহ ইঙ্গিত দিচ্ছে; দেশের দারিদ্র্য হার ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ২২ দশমিক ৯ শতাংশে দাঁড়ানোর আশঙ্কা রয়েছে। এর অর্থ হলো, নতুন করে আরও প্রায় ৩০ লাখ মানুষ চরম দারিদ্র্যের শিকার হতে পারে। পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) মতে, দেশের প্রতি চারজনের একজন এখন দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান বলেন, টানা তিন বছরের উচ্চ মূল্যস্ফীতি মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকিয়ে দিয়েছে। তিনি পরামর্শ দেন যে, টিসিবির বর্তমান বিতরণ ব্যবস্থা আরও আধুনিক ও সম্প্রসারিত করা প্রয়োজন। বিশেষ করে শিল্পাঞ্চল ও শ্রমজীবী মানুষের জন্য এলাকাভিত্তিক বিশেষ ব্যবস্থার মাধ্যমে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার ভোগান্তি কমানো সম্ভব।
রমজান উপলক্ষে টিসিবি দেশব্যাপী যে ৩.৫ মিলিয়ন ভোক্তার মাঝে ২৩ হাজার টন পণ্য বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, তা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, সরকার বাজার নিয়ন্ত্রণে কঠোর হওয়ার পাশাপাশি টিসিবির মতো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলোর আওতা আরও বৃদ্ধি করবে।