খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ১ মার্চ ২০২৬
সুনামগঞ্জে এক কলেজছাত্রীকে প্রবাসী সেজে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণ এবং সেই দৃশ্য ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার অপরাধে মহিবুর রহমান নামের এক যুবককে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করেছেন আদালত। আজ রোববার সুনামগঞ্জের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মুহাম্মদ হাবিবুল্লাহ জনাকীর্ণ আদালতে এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন। রায়ে কারাদণ্ডের পাশাপাশি আসামিকে এক লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করা হয়েছে।
মামলার বিবরণী থেকে জানা যায়, ঘটনার সূত্রপাত ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। দণ্ডপ্রাপ্ত মহিবুর রহমান জেলার দোয়ারাবাজার উপজেলার নরসিংপুর ইউনিয়নের তেরাপুর গ্রামের বাসিন্দা। তিনি নিজেকে ফ্রান্স প্রবাসী হিসেবে পরিচয় দিয়ে ছাতক পৌর শহরের এক কলেজছাত্রীর সঙ্গে মুঠোফোনে সখ্যতা গড়ে তোলেন। প্রতারক মহিবুর নিজেকে বিপুল সম্পদের মালিক দাবি করে ভুক্তভোগী তরুণীকে প্রেমের জালে আবদ্ধ করেন এবং তাঁকে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ফ্রান্সে নিয়ে যাওয়ার আশ্বাস দেন।
কিছুদিন পর মহিবুর দেশে ফেরার নাটক সাজান এবং তরুণীর সঙ্গে দেখা করার প্রস্তাব দেন। ২০১৯ সালের ১১ নভেম্বর মহিবুর তাঁর এক বন্ধুর সহায়তায় ওই ছাত্রীকে ফুসলিয়ে ছাতক পৌর শহরের একটি আবাসিক হোটেলে নিয়ে যান। সেখানে বিয়ের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে তিনি তরুণীকে বারবার ধর্ষণ করেন। পৈশাচিক এই কর্মকাণ্ডের এখানেই শেষ নয়; মহিবুর অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে ধর্ষণের দৃশ্য মুঠোফোনে ভিডিও করেন এবং বেশ কিছু আপত্তিকর স্থিরচিত্র ধারণ করেন।
| বিষয় | বিবরণ |
| আদালতের নাম | নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল, সুনামগঞ্জ |
| প্রধান আসামি | মহিবুর রহমান (পিতা: গৌছ আলী) |
| অপরাধের ধরণ | ধর্ষণ, প্রতারণা ও পর্নোগ্রাফি আইনের লঙ্ঘন |
| দণ্ডাদেশ | যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও ১ লক্ষ টাকা জরিমানা |
| জরিমানার প্রাপক | নির্যাতনের শিকার ভুক্তভোগী নারী |
| আসামির বর্তমান অবস্থা | পলাতক |
ধর্ষণের ঘটনার পর ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী শারীরিক ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। এক পর্যায়ে তিনি বুঝতে পারেন যে মহিবুর কখনোই ফ্রান্সে ছিলেন না এবং তাঁর সমস্ত পরিচয়ই ছিল সাজানো। প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে পেরে তরুণী মহিবুরের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে মহিবুর ধারণকৃত সেই গোপন ভিডিও ও ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেন, যা ভুক্তভোগী ও তাঁর পরিবারের জন্য চরম অবমাননাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে।
সামাজিক লোকলজ্জা উপেক্ষা করে ন্যায়বিচারের আশায় ওই তরুণী ছাতক থানায় পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন ও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি মামলা দায়ের করেন। পুলিশ দীর্ঘ তদন্ত শেষে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয়। আদালত দীর্ঘ শুনানি ও সাক্ষ্যপ্রমাণ পর্যালোচনা করে আজ এই রায় প্রদান করেন।
সুনামগঞ্জের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) শামসুর রহমান রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, বিচারক তাঁর রায়ে উল্লেখ করেছেন যে আসামির এই অপরাধ ক্ষমার অযোগ্য। প্রযুক্তির অপব্যবহার করে একজন নারীর সম্মানহানি করা এবং প্রতারণার মাধ্যমে জীবন ধ্বংস করার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হিসেবে এই যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। রায়ে আরও বলা হয়েছে, জরিমানার এক লক্ষ টাকা নির্যাতনের শিকার তরুণী পাবেন এবং পলাতক আসামিকে গ্রেপ্তারে পুলিশি তৎপরতা অব্যাহত থাকবে।
এই রায়ের মাধ্যমে সমাজে একটি শক্ত বার্তা পৌঁছেছে যে, ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে নারীদের সম্মানহানি বা শারীরিক নির্যাতনের মতো অপরাধ করলে কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। ভুক্তভোগী পরিবার এই রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছে এবং দ্রুত আসামিকে গ্রেপ্তার করে সাজা কার্যকর করার দাবি জানিয়েছে।