খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ২ মার্চ ২০২৬
ইরানের সামরিক ও কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক ভয়াবহ বিমান হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক মহাপ্রলয়ংকারী অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাবে বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি সরবরাহ ধমনী হিসেবে পরিচিত ‘হরমুজ প্রণালি’ এখন কার্যত অচল। বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার এই প্রধান প্রবেশমুখে বর্তমানে শত শত বিশালাকার জাহাজ আটকা পড়ে আছে, যা বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হওয়ার এবং এক দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক মন্দার শঙ্কা বাড়িয়ে দিয়েছে।
জাহাজ ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্ম ‘মেরিন ট্রাফিক’-এর সাম্প্রতিক উপাত্তের ভিত্তিতে বার্তা সংস্থা রয়টার্স এক উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালির দুই প্রান্তের প্রবেশমুখে অন্তত ১৫০টি অতি-বৃহৎ অপরিশোধিত তেলবাহী ট্যাংকার (VLCC) এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) বহনকারী জাহাজ খোলা সমুদ্রে নোঙর করে আছে। শিপিং বিশ্লেষকরা এই অভূতপূর্ব জাহাজজটকে ‘ভাসমান তেলের পাহাড়’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। নিরাপত্তার অভাবে জাহাজগুলো বর্তমানে ইরাক, সৌদি আরব এবং কাতারের উপকূলীয় জলসীমায় অবস্থান নিচ্ছে।
হরমুজ প্রণালি কেবল একটি জলপথ নয়, বরং এটি বৈশ্বিক অর্থনীতির লাইফলাইন। বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশ এবং মোট এলএনজি সরবরাহের এক-পঞ্চমাংশ এই সরু পথটি দিয়ে প্রবাহিত হয়। ওমান ও ইরানের মধ্যবর্তী এই ‘চোকপয়েন্ট’ বা সংকীর্ণ পথে জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হওয়া মানে হলো বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ চেইন পুরোপুরি ভেঙে পড়া।
নিচে হরমুজ প্রণালির বর্তমান পরিস্থিতি ও এর অর্থনৈতিক গুরুত্বের একটি তুলনামূলক সারণি দেওয়া হলো:
| বিষয়ের ক্ষেত্র | পরিসংখ্যান ও বর্তমান স্থিতি | বৈশ্বিক প্রভাব |
| আটকা পড়া ট্যাংকার | ১৫০টিরও বেশি বিশালাকার জাহাজ | জ্বালানি সরবরাহে কৃত্রিম সংকট ও মূল্যবৃদ্ধি। |
| তেল সরবরাহের হার | বৈশ্বিক চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশ | আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যারেল প্রতি তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়ানোর ঝুঁকি। |
| এলএনজি সরবরাহ | বৈশ্বিক চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশ | ইউরোপ ও এশিয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি। |
| রপ্তানিকারক দেশ | সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত ও ইরাক | মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর রাজস্ব আয়ে বড় ধরনের বিপর্যয়। |
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় তেল উৎপাদনকারী কোম্পানি এবং আন্তর্জাতিক ট্রেডিং হাউসগুলো তাদের জাহাজগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে চরম উদ্বিগ্ন। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান হরমুজ প্রণালি দিয়ে তাদের কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছে। ফলে কাতারের এলএনজি এবং সৌদি আরবের তেলের চালানগুলো সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছে না। এই অচলাবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হলে শিল্পোন্নত দেশগুলোর উৎপাদন ক্ষমতা হ্রাস পাবে এবং পরিবহণ ব্যয় বৃদ্ধির ফলে বিশ্বজুড়ে নতুন করে মুদ্রাস্ফীতির ঢেউ আছড়ে পড়বে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট কেবল তেলের দাম বাড়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটি বৈশ্বিক শেয়ার বাজার থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থাকেও পঙ্গু করে দিতে পারে। যদি কয়েক দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি নিরাপদ ঘোষণা করা না হয়, তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ের অন্যতম বড় জ্বালানি সংকটের মুখোমুখি হতে পারে বিশ্ব। বিশেষ করে এশিয়ার আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য এটি এক চরম অশনি সংকেত।