খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৫ মার্চ ২০২৬
বাংলাদেশ ব্যাংকের শীর্ষ নেতৃত্বে পরিবর্তনের পর দেশের মুদ্রানীতি ও সুদহার নির্ধারণের কৌশল নিয়ে নতুন করে অস্থিরতা ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই নীতি সুদহার (Policy Rate) কমানোর যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তা বর্তমানে এক বড় ধরনের হোঁচট খেয়েছে। এই পরিস্থিতির মধ্যেই মুদ্রানীতি কমিটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য এবং প্রথিতযশা অর্থনীতিবিদ ড. সাদিক আহমেদ পদত্যাগ করেছেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বুধবার (৪ মার্চ) পূর্বনির্ধারিত মুদ্রানীতি কমিটির গুরুত্বপূর্ণ সভাটি অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করা হয়েছে।
নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ঋণের সুদহার কমিয়ে বিনিয়োগ ত্বরান্বিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করছেন। এরই ধারাবাহিকতায় বর্তমান ১০ শতাংশ নীতি সুদহারকে আরও কমিয়ে আনার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছিল। গভর্নরের পক্ষ থেকে এই হার ০.২৫ থেকে ০.৫০ বেসিস পয়েন্ট কমানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। অর্থনীতির তাত্ত্বিক কাঠামো অনুযায়ী, নীতি সুদহার কমলে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে টাকা ধার করা সস্তা হয়, যার ফলে বাজারে ঋণের প্রবাহ বাড়ে এবং ঋণের সুদহার কমে আসে। তবে বর্তমানে দেশের মূল্যস্ফীতি যেখানে দুই অঙ্কের কাছাকাছি অবস্থান করছে, সেখানে সুদহার কমানোর এই সিদ্ধান্তকে অনেক বিশেষজ্ঞ ‘আত্মঘাতী’ ও ‘বিতর্কিত’ বলে মনে করছেন।
| সদস্যের নাম | পদবি ও প্রতিষ্ঠান | কমিটিতে ভূমিকা |
| মো. মোস্তাকুর রহমান | গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক | চেয়ারম্যান |
| মো. হাবিবুর রহমান | ডেপুটি গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক | সদস্য |
| মো. আখতার হোসেন | প্রধান অর্থনীতিবিদ, বাংলাদেশ ব্যাংক | সদস্য |
| এ কে এনামুল হক | মহাপরিচালক, বিআইডিএস | সদস্য |
| ফেরদৌসী নাহার | চেয়ারম্যান, অর্থনীতি বিভাগ, ঢাবি | সদস্য |
| মাহমুদ সালাহউদ্দিন নাসের | নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক | সদস্য |
| ড. সাদিক আহমেদ | ভাইস চেয়ারম্যান, পিআরআই | পদত্যাগকারী সদস্য |
মুদ্রানীতি কমিটির একমাত্র মনোনীত সদস্য ড. সাদিক আহমেদের পদত্যাগ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন নীতিনির্ধারণী কৌশলে এক বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ড. সাদিক আহমেদ পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) ভাইস চেয়ারম্যান এবং বিশ্বব্যাংকের সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা হিসেবে দেশের অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণে বিশেষ সুনাম রাখেন।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, উচ্চ মূল্যস্ফীতির এই সংকটকালীন সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যেখানে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি (Tight Monetary Policy) অনুসরণ করার কথা, সেখানে নতুন গভর্নরের সম্প্রসারণমূলক বা শিথিল মুদ্রানীতি গ্রহণের ইচ্ছা সাদিক আহমেদের মতো রক্ষণশীল অর্থনীতিবিদদের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর এবং সাদিক আহমেদ দীর্ঘকাল মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের স্বার্থে সুদহার বৃদ্ধির পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। ধারণা করা হচ্ছে, নতুন প্রশাসনের এই ইউ-টার্ন বা নীতিগত পরিবর্তনের সাথে একমত হতে না পেরেই তিনি পদত্যাগের পথ বেছে নিয়েছেন।
বিআইডিএসের মহাপরিচালক এ কে এনামুল হক নিশ্চিত করেছেন যে, মঙ্গলবার বিকেলেই তাদের জানানো হয়েছিল যে বুধবারের সভাটি হচ্ছে না। ঈদের ছুটির পর এই সভা অনুষ্ঠিত হতে পারে বলে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। তবে সাদিক আহমেদের পদত্যাগ এবং সুদহার কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে যে দ্বিধাবিভক্তি তৈরি হয়েছে, তা প্রশমন করা নতুন গভর্নরের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না এনে কেবল বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষ্যে সুদহার কমিয়ে দিলে তা মুদ্রা সরবরাহ বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিতে পারে। এতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা আরও কঠিন হয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা এবং নীতিগত দ্বন্দ্ব দেশের ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতার ওপর কী প্রভাব ফেলে, সেটিই এখন বড় আলোচনার বিষয়।