খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ৮ মার্চ ২০২৬
দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে বৈমানিক ইতিহাসে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করল মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা (NASA)। শব্দের চেয়ে দ্রুতগতিতে চললেও কোনো বিকট শব্দ বা ‘সনিক বুম’ তৈরি করবে না—এমন বিশেষ প্রযুক্তির পরীক্ষামূলক উড়োজাহাজ এক্স–৫৯ (X-59) প্রথমবারের মতো সফলভাবে আকাশে ডানা মেলেছে। ক্যালিফোর্নিয়ার পামডেলের মার্কিন বিমানবাহিনীর প্ল্যান্ট ৪২ থেকে উড্ডয়ন করে এটি এডওয়ার্ডসের নাসা আর্মস্ট্রং ফ্লাইট রিসার্চ সেন্টারে নিরাপদ অবতরণ করার মাধ্যমে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক স্পর্শ করেছে।
সাধারণত কোনো বস্তু যখন শব্দের গতিবেগ (ঘণ্টায় প্রায় ৭৬৭ মাইল) অতিক্রম করে, তখন বায়ুমণ্ডলে এক ধরণের তীব্র শকওয়েভ বা প্রচণ্ড বিস্ফোরণধর্মী শব্দের সৃষ্টি হয়, যাকে বলা হয় ‘সনিক বুম’। ১৯৭৩ সাল থেকে এই তীব্র শব্দের কারণে সৃষ্ট জনবিরক্তি ও স্থাপনার ক্ষতির আশঙ্কায় আমেরিকার স্থলভাগের ওপর দিয়ে বেসামরিক সুপারসনিক উড্ডয়ন নিষিদ্ধ ছিল।
নাসা এবং প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান লকহিড মার্টিনের যৌথ প্রচেষ্টায় তৈরি এই এক্স–৫৯ জেটের নকশা এমনভাবে করা হয়েছে যাতে এটি সাউন্ড ব্যারিয়ার ভাঙার সময় কোনো বিকট শব্দ করবে না। নাসার দাবি অনুযায়ী, এটি ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়ার সময় মাটিতে থাকা মানুষ বড়জোর একটি মৃদু ‘থাম্প’ বা চাপা শব্দ শুনতে পাবেন, যা অনেকটা পাশের বাড়ির গাড়ির দরজা লাগানোর শব্দের মতো।
এই উড়োজাহাজটি কেবল গতির জন্যই নয়, এর অনন্য গঠনশৈলীর জন্যও বিশেষ। এর দীর্ঘ ও সরু নাসিকা বা সামনের অংশ শকওয়েভগুলোকে একে অপরের সঙ্গে মিশে বিকট শব্দ তৈরি করতে বাধা দেয়। নিচে বিমানটির প্রধান কারিগরি দিকগুলো তুলে ধরা হলো:
| বৈশিষ্ট্য | তথ্য ও পরিসংখ্যান |
| পুরো নাম | এক্স-৫৯ কুইয়েট সুপারসনিক টেকনোলজি (QueSST) |
| নির্মাতা প্রতিষ্ঠান | নাসা ও লকহিড মার্টিন (স্কunk Works) |
| দৈর্ঘ্য | ৯৯.৭ ফুট |
| ডানার বিস্তার | ২৯.৫৭ ফুট |
| ইঞ্জিন | জেনারেল ইলেকট্রিক F414-GE-100 |
| সর্বোচ্চ গতিবেগ | ম্যাক ১.৫ (প্রায় ৯৯০ মাইল প্রতি ঘণ্টা) |
| ভ্রমণ উচ্চতা | ৫৫,০০০ ফুট |
এক্স–৫৯-এর নকশায় সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হলো এর ককপিট। বিমানটির সামনের অংশ অত্যন্ত দীর্ঘ হওয়ায় পাইলটের পক্ষে সরাসরি সামনে দেখা অসম্ভব। এই সমস্যা সমাধানে নাসা ‘এক্সটার্নাল ভিশন সিস্টেম’ (XVS) ব্যবহার করেছে। পাইলট সামনের জানালার পরিবর্তে একটি হাই-ডেফিনিশন ৪কে (4K) মনিটরের মাধ্যমে সামনের দৃশ্য পর্যবেক্ষণ করেন, যা ক্যামেরার সাহায্যে বাস্তব সময়ের দৃশ্য ফুটিয়ে তোলে।
এই সফল উড্ডয়ন নাসার ‘কোয়েস্ট’ (Quesst) মিশনের অংশ। ২০২৫ সালে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পর এই প্রকল্পের গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে গেছে। আগামী দিনগুলোতে নাসা এই বিমানটি যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন জনবসতিপূর্ণ শহরের ওপর দিয়ে উড়িয়ে নিয়ে যাবে এবং নিচ থেকে সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া সংগ্রহ করবে। এই সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করে আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কাছে জমা দেওয়া হবে, যাতে ভবিষ্যতে বাণিজ্যিক সুপারসনিক বিমান চলাচলের পথ সুগম হয়। যদি এই প্রকল্প সফল হয়, তবে নিউইয়র্ক থেকে লন্ডন বা লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে টোকিও যাওয়ার সময় প্রায় অর্ধেক কমে আসবে।