দেশজুড়ে নদী থেকে লাশ উদ্ধারের ঘটনা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যে দেখা যাচ্ছে, এসব লাশের একটি বড় অংশের ক্ষেত্রে ধারণা করা হয় যে হত্যাকাণ্ড অন্যত্র সংঘটিত হয়েছে এবং অপরাধীরা প্রমাণ নষ্ট করার উদ্দেশ্যে লাশ নদীতে ফেলে দিয়েছে। এতে তদন্ত জটিল হয়ে ওঠে এবং অনেক ক্ষেত্রেই নিহত ব্যক্তিদের পরিচয় দীর্ঘ সময়েও শনাক্ত করা সম্ভব হয় না।
নৌ পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে দেশের বিভিন্ন নদী থেকে দুই হাজারের বেশি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ৬০০টির বেশি লাশের পরিচয় এখনো অজানা। অপরাধ তদন্তকারীদের মতে, পানিতে লাশ ফেলে দিলে দ্রুত পচন শুরু হয়, আঙুলের ছাপ মুছে যায় এবং দেহের বিভিন্ন অংশ নষ্ট হয়ে যায়। ফলে পরিচয় শনাক্ত করা এবং হত্যার প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
নৌ পুলিশের তথ্য অনুযায়ী সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নদী থেকে উদ্ধার হওয়া লাশের একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র নিচের সারণিতে তুলে ধরা হলো—
| বছর/সময়কাল |
উদ্ধার হওয়া লাশের সংখ্যা |
মন্তব্য |
| ২০২১–২০২৫ (মোট) |
২,০৬৪ |
নৌ পুলিশের হিসাব |
| পরিচয় শনাক্ত |
১,৪২৫ |
অধিকাংশ ক্ষেত্রে আঙুলের ছাপ ও তদন্তে শনাক্ত |
| পরিচয় অজানা |
৬৩৯ |
তদন্ত এখনো অমীমাংসিত |
| ২০২৪ সাল |
প্রায় ৪৪০ |
বিভিন্ন থানায় অন্তত ৪১টি হত্যা মামলা |
| গত বছরের জানুয়ারি–জুলাই |
অন্তত ৩০১ |
নারী, পুরুষ ও শিশু |
তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, অনেক সময় নদী থেকে উদ্ধার হওয়া লাশের সঙ্গে নিখোঁজ ব্যক্তিদের সাধারণ ডায়েরি (জিডি) মিলিয়ে দেখা হয়। তবে আঙুলের ছাপ নষ্ট হয়ে গেলে শনাক্তকরণ আরও কঠিন হয়ে ওঠে। সে ক্ষেত্রে ডিএনএ নমুনা সংরক্ষণ করে রাখা হয়, যাতে ভবিষ্যতে কেউ দাবি করলে মিলিয়ে দেখা যায়।
এ ধরনের একটি ঘটনার উদাহরণ পাওয়া যায় নারায়ণগঞ্জে। গত বছরের ২৮ আগস্ট শীতলক্ষ্যা নদী থেকে একটি মস্তকবিহীন লাশ উদ্ধার করা হয়। পরে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের সহায়তায় আঙুলের ছাপ মিলিয়ে নিহত ব্যক্তির পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়। তিনি ছিলেন ২৭ বছর বয়সী হাবিব, সোনারগাঁ উপজেলার মধ্য কাঁচপুর এলাকার বাসিন্দা। তবে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তার মাথা এখনো উদ্ধার হয়নি। এ ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
অন্যদিকে একই সময়ে বুড়িগঙ্গা নদী থেকে অজ্ঞাত এক নারী ও শিশুর লাশ উদ্ধার করা হয়। ময়নাতদন্তে জানা যায়, শ্বাসরোধে হত্যার পর লাশ নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। ঘটনার ছয় মাস পার হলেও তাদের পরিচয় এখনো জানা যায়নি। আঙুলের ছাপ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, নদীতে ফেলে দেওয়া লাশের কারণে তদন্তে নানা ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি হয়। কখনো মাছের কামড়, কখনো জাহাজের ধাক্কায় সৃষ্ট ক্ষত দেখে হত্যার প্রকৃতি নির্ধারণ করাও কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক সময় প্রাথমিকভাবে অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করা হলেও পরে ময়নাতদন্তে হত্যার প্রমাণ মিললে তা হত্যা মামলায় রূপ নেয়।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, সংঘবদ্ধ অপরাধে জড়িত ব্যক্তিরা প্রায়ই হত্যার আগেই পরিকল্পনা করে কোথায় লাশ ফেলা হবে। নদী বা রেলপথকে তারা বেছে নেয় কারণ সেখানে প্রমাণ দ্রুত নষ্ট হয়ে যায় এবং পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
নৌ পুলিশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কোনো লাশের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব না হলে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। তবে ডিএনএ নমুনা সংরক্ষণ করা থাকে এবং নতুন কোনো সূত্র পাওয়া গেলে মামলা আবারও সক্রিয় করা হয়। তদন্তকারীদের মতে, অজ্ঞাত এই শত শত লাশের পেছনে লুকিয়ে আছে অসংখ্য অমীমাংসিত হত্যাকাণ্ডের গল্প, যা এখনো ন্যায়বিচারের অপেক্ষায়।