খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ৮ মার্চ ২০২৬
পশ্চিমবঙ্গের ভুটান সীমান্তবর্তী টোটোপাড়া গ্রামে বসবাসকারী টোটো সম্প্রদায় ভারতের অন্যতম প্রাচীন ও বিপন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠী। বহুদিন ধরে তাদের নিজস্ব ভাষা থাকলেও লিখিত কোনো বর্ণমালা না থাকায় ভাষাটি হারিয়ে যাওয়ার প্রাক্কালে ছিল। আশ্চর্যের বিষয়, এই ভাষার জন্য স্বতন্ত্র বর্ণমালা তৈরির প্রেরণা এসেছে বাংলাদেশের প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী রুনা লায়লা’র গাওয়া একটি গান থেকে।
প্রায় চার দশক আগে রুনা লায়লার ‘তুমি আমি লিখি প্রাণের বর্ণমালা’ গানটির একটি লাইন ধনীরাম টোটো’র মনে গভীর দাগ কাটে। তিনি বলেন, “যদি অন্য ভাষার নিজস্ব বর্ণমালা থাকতে পারে, তবে টোটো ভাষার কেন থাকবে না?” এই প্রশ্ন থেকেই শুরু হয় তার দীর্ঘ গবেষণা ও প্রচেষ্টা।
পরবর্তীতে তিনি টোটো ভাষার জন্য একটি স্বতন্ত্র লিপি তৈরি করেন, যা এখন ‘টোটো-হরফ’ বা ‘তোত্বিকো আল্লাবেত’ নামে পরিচিত। এই প্রচেষ্টার জন্য ভারত সরকার ধনীরাম টোটোকে পদ্মশ্রী পুরস্কারে ভূষিত করে। এছাড়া, ভাষার সংরক্ষণে স্থানীয়ভাবে টোটো সম্প্রদায় বাংলা বর্ণমালা ব্যবহার করে টোটো ভাষার শব্দ সংগ্রহ, গল্প লেখা এবং প্রাথমিক শিক্ষার জন্য নথিভুক্তকরণের উদ্যোগও নিয়েছে।
নিচের টেবিলে টোটো ভাষার সংরক্ষণ ও উদ্যোগগুলোর সংক্ষিপ্ত চিত্র দেওয়া হলোঃ
| উদ্যোগ | উদ্যোগের ধরণ | দায়িত্বশীল ব্যক্তি/গোষ্ঠী | বর্তমান অবস্থা |
|---|---|---|---|
| টোটো-হরফ তৈরি | স্বতন্ত্র লিপি | ধনীরাম টোটো | ব্যবহার শুরু হয়েছে, শিক্ষায় প্রয়োগ |
| শব্দ ও গল্প সংগ্রহ | ভাষা নথিভুক্তকরণ | টোটো সম্প্রদায় | চলমান উদ্যোগ |
| প্রাথমিক শিক্ষা | বিদ্যালয়ে ভাষা ব্যবহার | স্থানীয় শিক্ষক ও সম্প্রদায় | সীমিত প্রয়োগ, সম্প্রসারণ প্রক্রিয়ায় |
| সচেতনতা ও প্রচার | সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান | সম্প্রদায় ও স্থানীয় সংগঠন | নিয়মিত আয়োজন হচ্ছে |
তবু চ্যালেঞ্জ কম নয়। আধুনিক শিক্ষা, বহিরাগত সংস্কৃতির প্রভাব ও সীমিত জনসংখ্যার কারণে টোটো ভাষা সংরক্ষণ এখনও কঠিন। তবে নতুন প্রজন্মকে সঙ্গে নিয়ে সম্প্রদায় সচেষ্ট।
মে মাসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেশে ফেরার পর ৫ মার্চ রুনা লায়লাকে এই বিষয়টি জানানো হয়। তিনি জানান, বিষয়টি দেখেছেন এবং শুভাকাঙ্ক্ষীদের কয়েকজনও প্রতিবেদন পাঠিয়েছেন। তিনি বলেন, “একটি গান শুধু বিনোদন নয়, মানুষের মনের ভেতরে ঢুকে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। প্রত্যেক গানই এক ধরনের বার্তা দেয়। যে গানটি আমার গাওয়া, তা একটি বিপন্ন জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে তাদের উদ্বুদ্ধ করেছে—এটি সত্যিই অবিশ্বাস্য।”
গানটির পেছনের গল্পও শেয়ার করেন তিনি। গানটি লিখেছেন শামসুর রাহমান, সুর করেছেন খন্দকার নূরুল আলম, এবং ১৯৭০-এর দশকের শেষের দিকে বাংলাদেশ বেতারে রেকর্ড ও পরবর্তীতে টেলিভিশনে পরিবেশন করা হয়।
রুনা লায়লা বলেন, “৪৫ বছর আগের একটি গান শুনে তারা নিজেদের ভাষার জন্য বর্ণমালা তৈরি করেছে—এটি সত্যিই অদ্ভূত। আমার গাওয়া গান, সুর ও কথাগুলো একটি বিপন্ন আদিবাসী জাতির জীবনে নতুন ভাবনা সৃষ্টি করেছে—এটি আনন্দের বিষয়।”
এই ঘটনাটি প্রমাণ করে, শিল্প ও সংগীতের শক্তি শুধু বিনোদন নয়, বরং সংস্কৃতি ও ভাষার সংরক্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।