খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১০ মার্চ ২০২৬
সম্প্রতি ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এক চাঞ্চল্যকর তথ্যে জানিয়েছেন যে, ইরানের তৈরি ড্রোন এবং অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার (ইডব্লিউ) মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের ১১টি দেশ ইউক্রেনের কাছে বিশেষ কারিগরি ও সামরিক সহায়তা চেয়েছে। দীর্ঘ চার বছর ধরে রাশিয়ার আগ্রাসন মোকাবিলা করতে গিয়ে ইউক্রেনীয় বাহিনী ড্রোন ধ্বংস এবং সিগন্যাল জ্যামিংয়ের ক্ষেত্রে যে অনন্য অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে, এখন তা পশ্চিমা বিশ্বের জন্য এক অপরিহার্য সম্পদে পরিণত হয়েছে।
সোমবার ইউক্রেনের শীর্ষ সামরিক ও সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক শেষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক বার্তায় জেলেনস্কি এই তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি উল্লেখ করেন, ইরানের তৈরি ‘শাহেদ’ ড্রোনের ক্রমাগত হুমকি এবং এ সংক্রান্ত ইলেকট্রনিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ইউক্রেনের অর্জিত দক্ষতা বিশ্বজুড়ে সমাদৃত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি ইউরোপের কয়েকটি দেশ এবং ইরানের প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোও এই নিরাপত্তা সহযোগিতার জন্য কিয়েভের দ্বারস্থ হয়েছে।
ইউক্রেন মনে করছে, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে তাদের এই সামরিক অভিজ্ঞতা মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে দর-কষাকষির ক্ষেত্রে কিয়েভকে আরও সুবিধাজনক অবস্থানে নিয়ে যাবে। জেলেনস্কি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে জানান যে, ইউক্রেনের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় যারা পাশে দাঁড়িয়েছে, তাদের সহায়তায় কিয়েভ সর্বদা প্রস্তুত। ইতিমধ্যেই কয়েকটি দেশের অনুরোধের প্রেক্ষিতে ‘সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত ও বিশেষ সহায়তা’ প্রদান করা হয়েছে বলেও তিনি ইঙ্গিত দেন।
প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউক্রেন এখন ড্রোন যুদ্ধের এক বিশাল গবেষণাগারে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে রাশিয়ার ব্যবহৃত ইরানি শাহেদ-১৩৬ ড্রোন ভূপাতিত করার ক্ষেত্রে ইউক্রেনীয় প্রকৌশলীরা শতভাগ সাফল্য অর্জনের কাছাকাছি পৌঁছেছেন। এর আগে নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জেলেনস্কি জানিয়েছিলেন, ওয়াশিংটনের অনুরোধে জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো রক্ষায় ইউক্রেন ইতিমধ্যেই বিশেষ ড্রোন ধ্বংসকারী ব্যবস্থা এবং একটি বিশেষজ্ঞ কারিগরি দল পাঠিয়েছে।
ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার এবং আধুনিক যুদ্ধকৌশল
আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার বা ইডব্লিউ হলো অদৃশ্য শক্তির লড়াই। এটি মূলত তিনটি প্রধান স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে: ইলেকট্রনিক অ্যাটাক (EA), ইলেকট্রনিক সুরক্ষা এবং ইলেকট্রনিক সহায়তা (ES)। এর মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত পদ্ধতি হলো ‘জ্যামিং’, যা মূলত শত্রুপক্ষের রেডিও বা রাডার তরঙ্গে বিঘ্ন ঘটিয়ে তাদের যোগাযোগ ব্যবস্থা অচল করে দেয়।
নিচে ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ারের প্রধান দিক এবং রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যবহৃত কিছু উল্লেখযোগ্য সিস্টেমের তুলনা তুলে ধরা হলো:
| সিস্টেমের নাম | ধরণ ও কাজ | সক্ষমতা ও প্রভাব |
| আর-৩৩০ জেডএইচ জিটেল | রুশ জ্যামিং সিস্টেম | ১০ কিমি ব্যাসার্ধের মধ্যে ভিএইচএফ/ইউএইচএফ ব্যান্ড, জিপিএস ও স্যাটেলাইট যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করতে সক্ষম। |
| আরবি-৩৪১ভি লিয়ার-৩ | ইলেকট্রনিক অ্যাটাক সিস্টেম | মোবাইল নেটওয়ার্ক হাইজ্যাক করে ভুয়া বার্তা পাঠানো এবং শত্রু সেনাদের অবস্থান শনাক্তকরণে ব্যবহৃত হয়। |
| শাহেদ-১৩৬ ড্রোন | ইরানি কামিকাজে ড্রোন | স্বল্প খরচে নিখুঁত লক্ষ্যে আঘাত হানতে সক্ষম, যা বর্তমানে ইউক্রেনীয় ইডব্লিউ সিস্টেমের প্রধান লক্ষ্য। |
| অরল্যান-১০ ড্রোন | গোয়েন্দা ও ইডব্লিউ ড্রোন | এটি লিয়ার-৩ সিস্টেমের সাথে যুক্ত হয়ে বিস্তৃত এলাকায় নেটওয়ার্ক জ্যামিং এবং তথ্য সংগ্রহের কাজ করে। |
২০১৪ সাল থেকেই রাশিয়া পূর্ব ইউক্রেনে লিয়ার-৩ সিস্টেম ব্যবহার করে স্থানীয় মোবাইল নেটওয়ার্ক দখল করে প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর কাজ চালিয়ে আসছিল। তবে গত চার বছরে ইউক্রেনীয় বাহিনী এসব প্রযুক্তিকে কেবল রুখতেই শেখেনি, বরং সেগুলোকে অকেজো করার নিজস্ব প্রযুক্তিও উদ্ভাবন করেছে।
ইউক্রেনের এই প্রতিরক্ষা সক্ষমতা এখন কেবল তাদের নিজেদের ভূখণ্ড রক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ড্রোন এবং ইলেকট্রনিক সিগন্যাল নিয়ন্ত্রণের এই যুদ্ধকৌশলটি আগামী দিনের বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য একটি মডেল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির এই ঘোষণা প্রমাণ করে যে, সামরিক প্রযুক্তির ক্ষেত্রে ইউক্রেন এখন গ্রহীতা থেকে দাতা রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার পথে এগিয়ে যাচ্ছে।