খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১০ মার্চ ২০২৬
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার সলিমপুর ইউনিয়নে অবস্থিত জঙ্গল সলিমপুর এখন দেশের অন্যতম আলোচিত ও বিতর্কিত পাহাড়ি এলাকা। নামের সঙ্গে ‘জঙ্গল’ থাকলেও বাস্তবে এ অঞ্চলের অধিকাংশ পাহাড় এখন প্রায় উজাড় হয়ে গেছে। নির্বিচারে পাহাড় কাটা, অবৈধ বসতি স্থাপন, প্লট বিক্রির বাণিজ্য এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীর দাপটে এলাকাটি দীর্ঘদিন ধরেই প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ বোস্তামী এলাকা থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত এশিয়ান উইমেন ইউনিভার্সিটির বিপরীত দিকে লিংক সড়কের উত্তরে প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর পাহাড়ি জমি নিয়ে গড়ে উঠেছে জঙ্গল সলিমপুর। প্রশাসনিকভাবে এটি সীতাকুণ্ড উপজেলার অন্তর্ভুক্ত হলেও অবস্থানগত কারণে অনেকটাই চট্টগ্রাম নগরের ভেতরের অংশের মতো। পূর্ব দিকে হাটহাজারী উপজেলা এবং দক্ষিণে বায়েজিদ থানা এলাকা রয়েছে।
এ অঞ্চল মূলত দুটি ভাগে বিভক্ত—ছিন্নমূল এলাকা এবং আলীনগর। উভয় এলাকাতেই পাহাড় কেটে গড়ে উঠেছে অসংখ্য ঘরবাড়ি, দোকানপাট, বাজার ও ছোট ছোট বিপণিবিতান। পাহাড়ের ঢাল ও পাদদেশে তৈরি হয়েছে হাজার হাজার কাঁচা ও পাকা ঘর। পাশাপাশি অব্যাহত রয়েছে পাহাড় কেটে প্লট তৈরির বাণিজ্য।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নব্বইয়ের দশকে সন্ত্রাসী আলী আক্কাস প্রথম জঙ্গল সলিমপুরে পাহাড় কেটে বসতি স্থাপনের উদ্যোগ নেন। পাহাড়ি দুর্গমতার সুযোগ নিয়ে তিনি নিজস্ব সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলেন এবং খাসজমি দখল করে নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে প্লট বিক্রি শুরু করেন।
পরে প্লট বিক্রি ও প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে তার বাহিনীর মধ্যেই দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। একসময় র্যাবের সঙ্গে সংঘর্ষে আলী আক্কাস নিহত হন। এরপর তার সহযোগীরা আলাদা আলাদা দল গড়ে তোলে। তাদের মধ্যে কাজী মশিউর রহমান, ইয়াসিন মিয়া, গফুর মেম্বার ও গাজী সাদেক উল্লেখযোগ্য। বর্তমানে এসব গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন অংশে বসতি ও প্লট বাণিজ্য পরিচালিত হচ্ছে।
বর্তমানে দুইটি সংগঠন এই এলাকার বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে—আলীনগর বহুমুখী সমিতি এবং মহানগর ছিন্নমূল বস্তিবাসী সংগ্রাম পরিষদ। যারা প্লট কিনেছেন, তারাই এসব সংগঠনের সদস্য। দুই সংগঠন মিলিয়ে সদস্যসংখ্যা প্রায় ৩০ হাজার বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
জঙ্গল সলিমপুর দীর্ঘদিন ধরেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে পরিচিত। পাহাড়ি দুর্গম পথ, সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রভাব এবং বাইরের মানুষের প্রবেশে বিধিনিষেধের কারণে এখানে অভিযান পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ে।
সম্প্রতি এক অভিযানে গেলে র্যাবের এক কর্মকর্তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয় এবং আরও কয়েকজন সদস্য আহত হন। এরপর এলাকাটিতে সেনাবাহিনী, পুলিশ, র্যাব, সীমান্তরক্ষী বাহিনী ও বিশেষ পুলিশ বাহিনী যৌথ অভিযান চালায়।
অভিযানে অংশ নেওয়া কর্মকর্তারা জানান, নির্বিচারে পাহাড় কাটার কারণে দ্রুত পরিবেশগত বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। যদি দ্রুত ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তবে অদূর ভবিষ্যতে পুরো এলাকা পাহাড়শূন্য হয়ে পড়তে পারে।
জঙ্গল সলিমপুরে প্রবেশ করলে প্রথমেই চোখে পড়ে পাহাড় কেটে তৈরি করা সড়ক। রাস্তার দুই পাশে রয়েছে অসংখ্য বাড়িঘর, দোকানপাট ও বাজার। পাহাড়ের চূড়াতেও গড়ে উঠেছে বসতি। কোথাও কোথাও পাহাড় কেটে ইটের দেয়াল তুলে প্লট প্রস্তুত করা হয়েছে বিক্রির জন্য।
এস এম পাইলট উচ্চবিদ্যালয় এলাকাটি এ অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এর আশপাশে রয়েছে বাজার, দোকানপাট এবং রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যালয়। এখান থেকে বিভিন্ন দিকে রাস্তা চলে গেছে—আলীনগর, কাঁঠালতলা, লটকাটুলি ও লোহার ব্রিজ এলাকার দিকে। প্রায় প্রতিটি এলাকায় পাহাড় কেটে বসতি তৈরির চিহ্ন স্পষ্ট।
২০২২ সালে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন জঙ্গল সলিমপুর এলাকাকে ১১টি ভাগে বিভক্ত করে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা গ্রহণ করে। এসব প্রকল্পের মধ্যে ছিল নতুন কেন্দ্রীয় কারাগার, মডেল মসজিদ, নভোথিয়েটারসহ নানা সরকারি স্থাপনা নির্মাণ।
কারাগার নির্মাণের জন্য প্রায় ৫০ একর জমিও নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু অধিকাংশ জমি দখলে থাকায় প্রশাসন তা উদ্ধার করতে পারেনি। ফলে পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন স্থগিত হয়ে যায়।
যৌথ অভিযান শেষে চট্টগ্রাম রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক আহসান হাবীব পলাশ বলেন, এই এলাকায় প্রশাসনের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। সরকার যে উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, তা দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে উদ্যোগ নিতে হবে।
বিভাগীয় কমিশনার মো. জিয়াউদ্দীন জানান, প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর সরকার পূর্বনির্ধারিত উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| অবস্থান | সীতাকুণ্ড উপজেলা, চট্টগ্রাম |
| মোট আয়তন | প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর |
| প্রধান অংশ | ছিন্নমূল এলাকা ও আলীনগর |
| বসতি স্থাপনের শুরু | নব্বইয়ের দশক |
| প্রধান সমস্যা | পাহাড় কাটা, অবৈধ প্লট বাণিজ্য, সন্ত্রাসী প্রভাব |
| সম্ভাব্য উন্নয়ন পরিকল্পনা | কেন্দ্রীয় কারাগার, মডেল মসজিদ, অন্যান্য সরকারি স্থাপনা |
স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকে জানান, কম দামে জমি পেয়ে তারা এখানে বসতি গড়েছেন। তবে ভবিষ্যতে উচ্ছেদ করা হলে বিকল্প বাসস্থানের দাবি জানান তারা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জঙ্গল সলিমপুরের পাহাড় ও সরকারি জমি রক্ষায় দ্রুত ও কঠোর পদক্ষেপ না নিলে পরিবেশগত বিপর্যয় এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। তাই প্রশাসনের কঠোর নজরদারি এবং পরিকল্পিত উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নই এ অঞ্চলের স্থায়ী সমাধানের পথ বলে মনে করা হচ্ছে।