মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহন নিয়ে উদ্বেগ বাড়লেও বাংলাদেশের জন্য আশ্বস্তবার্তা দিয়েছে ইরান। দেশটি জানিয়েছে, বাংলাদেশের জন্য তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বহনকারী জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের ক্ষেত্রে কোনো বাধা দেওয়া হবে না। এর ফলে দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখার বিষয়ে কিছুটা স্বস্তি মিলেছে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সাম্প্রতিক উত্তেজনার কারণে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালি ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এই প্রণালিটি মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ অঞ্চল থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জ্বালানি পরিবহনের প্রধান পথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বৈশ্বিকভাবে সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেলের প্রায় এক–পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয় বলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বিশ্লেষকদের ধারণা।
এই পরিস্থিতিতে সম্ভাব্য জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নের আশঙ্কা থেকে বাংলাদেশ কূটনৈতিকভাবে ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ করে। জবাবে ইরান আশ্বাস দিয়েছে যে, বাংলাদেশের জ্বালানিবাহী জাহাজ প্রণালিতে প্রবেশের আগে তাদের অবহিত করা হলে সেই জাহাজগুলোর নিরাপদ চলাচলে কোনো ধরনের বাধা দেওয়া হবে না। ফলে আন্তর্জাতিক উত্তেজনার মধ্যেও বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখার পথ কিছুটা সহজ হয়েছে।
বর্তমানে বাংলাদেশ বিভিন্ন দেশ থেকে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করে। এসব আমদানির একটি বড় অংশ সমুদ্রপথে আসে, যার মধ্যে অনেক জাহাজকে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে হয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই নৌপথে কোনো বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহ সংকট দেখা দিতে পারে, যার প্রভাব বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর দ্রুত পড়ে।
বাংলাদেশ যেসব দেশ থেকে নিয়মিতভাবে পরিশোধিত জ্বালানি পণ্য আমদানি করে, সেগুলোর একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা নিচে দেওয়া হলো—
| দেশ | আমদানিকৃত পণ্যের ধরন |
|---|---|
| মালয়েশিয়া | পরিশোধিত জ্বালানি তেল |
| সংযুক্ত আরব আমিরাত | পরিশোধিত জ্বালানি তেল |
| চীন | জ্বালানি পণ্য |
| ইন্দোনেশিয়া | পরিশোধিত তেল |
| থাইল্যান্ড | জ্বালানি তেল |
| ভারত | বিভিন্ন জ্বালানি পণ্য |
| ওমান | পরিশোধিত তেল |
| কুয়েত | জ্বালানি তেল |
এদিকে সম্ভাব্য জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশকে সহায়তা করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে কয়েকটি বন্ধুপ্রতিম দেশ। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, সরকার পরিস্থিতির ওপর নিবিড় নজর রাখছে এবং প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখা হচ্ছে। তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে জ্বালানি ঘাটতির আশঙ্কা নেই।
ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনও জানিয়েছেন, জ্বালানি খাতে সহযোগিতা জোরদারে বাংলাদেশ ও চীন একসঙ্গে কাজ করবে। প্রয়োজন হলে বাংলাদেশকে অতিরিক্ত জ্বালানি সরবরাহ বা অন্যান্য সহায়তা দিতে তার দেশ প্রস্তুত রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বহুমুখী উৎস থেকে জ্বালানি আমদানি এবং কূটনৈতিক যোগাযোগ জোরদারের ফলে বৈশ্বিক অস্থিরতার মধ্যেও বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা বজায় রাখার সম্ভাবনা শক্তিশালী হয়েছে। সরকার একই সঙ্গে বিকল্প সরবরাহব্যবস্থা ও কৌশলগত মজুত বৃদ্ধির বিষয়েও গুরুত্ব দিচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক সংকটের প্রভাব কমিয়ে আনা যায়।