খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ১১ মার্চ ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি এক নতুন এবং ভয়াবহ মোড় নিয়েছে। ইরান কর্তৃক ইসরায়েলের জনবহুল মধ্যাঞ্চল লক্ষ্য করে নিক্ষেপ করা অত্যাধুনিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলোতে এবার ‘ক্লাস্টার’ বা গুচ্ছ বোমার ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়েছে। সোমবারের সেই ভয়াবহ হামলায় গুরুতর আহত আরও এক ব্যক্তির মঙ্গলবার মৃত্যু হওয়ায় মোট নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে দুইজনে। ইসরায়েলি স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের মতে, এই ধরনের হামলা বেসামরিক এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি করছে।
ইসরায়েলি সামরিক ও বেসামরিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের ছোড়া গুচ্ছ বোমাবাহী ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ইসরায়েলের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জনবহুল অন্তত ছয়টি স্থানে আঘাত হেনেছে। বিশেষ করে তেল আবিব সংলগ্ন শহরগুলোতে এই বোমার ছোট ছোট খণ্ড বা সাব-মিউনিশনগুলো ছড়িয়ে পড়ে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে। মঙ্গলবার নিহত দুই ব্যক্তির পরিচয় প্রকাশ করা হয়েছে; তাঁরা হলেন ৪০ বছর বয়সী রুস্তম গুলমোভ এবং আমিদ মুর্তুজোভ। উভয়েই পেতাহ তিকভা শহরের বাসিন্দা এবং পেশায় নির্মাণশ্রমিক ছিলেন।
নিচে হামলার শিকার প্রধান এলাকা এবং হতাহতের একটি পরিসংখ্যান দেওয়া হলো:
| হামলার শিকার শহরসমূহ | নিহতের সংখ্যা | আহতের সংখ্যা | ক্ষয়ক্ষতির ধরণ |
| ইয়েহুদ (Yehud) | ০২ জন | ০৫ জন | নির্মাণাধীন ভবন ও অবকাঠামো |
| অর ইয়েহুদা (Or Yehuda) | ০ | ০১ জন (গুরুতর) | আবাসিক অ্যাপার্টমেন্ট ও সড়ক |
| হোলোন ও বাত ইয়াম | ০ | ০৪ জন | জানমালের আংশিক ক্ষতি |
| পেতাহ তিকভা এলাকা | ০ | ০২ জন | খোলা মাঠ ও পার্কিং এলাকা |
ইসরায়েল প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইরানের এই বিশেষ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর ওয়ারহেড বা সামনের অংশটি ভূমি স্পর্শ করার আগেই আকাশপথে উন্মুক্ত হয়ে যায়। এটি প্রায় ৮ কিলোমিটার ব্যাসার্ধ জুড়ে ২৪ থেকে ৮০টি ছোট ছোট শক্তিশালী বোমা ছড়িয়ে দিতে সক্ষম।
প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্যসমূহ:
বিস্ফোরক ক্ষমতা: প্রতিটি ছোট বোমায় প্রায় ২.৫ কেজি বিস্ফোরক থাকে।
আক্রমণের পরিধি: একটি সাধারণ ক্ষেপণাস্ত্র যেখানে একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে আঘাত করে, সেখানে গুচ্ছ বোমা বিশাল এলাকা জুড়ে বৃষ্টির মতো ঝরে পড়ে।
অবিস্ফোরিত ঝুঁকি: এই বোমার একটি বড় অংশ মাটিতে পড়ার সাথে সাথে বিস্ফোরিত হয় না, যা পরবর্তী সময়ে সাধারণ মানুষের জন্য ‘মাইন’ হিসেবে মৃত্যুফাঁদ তৈরি করে।
ইসরায়েলি হোম ফ্রন্ট কমান্ডের প্রধান মেজর জেনারেল শাই ক্লাপার জানিয়েছেন, ইরানের সাধারণ ৫০০ কেজি ওজনের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় এই গুচ্ছ বোমাগুলো জনবসতিপূর্ণ এলাকায় অনেক বেশি আতঙ্ক ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে। তবে যারা সময়মতো আশ্রয়কেন্দ্রে প্রবেশ করতে পেরেছেন, তারা নিশ্চিত মৃত্যু থেকে রক্ষা পেয়েছেন।
ইয়েহুদ শহরের সেই নির্মাণস্থলে কর্মরত এক ক্রেনচালক ব্রিটিশ গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, সাইরেন বাজার পর তিনি তার ক্রেনটি নিরাপদ অবস্থায় আনতে কয়েক মিনিট সময় ব্যয় করেছিলেন। তিনি যখন নিচে নেমে ভূগর্ভস্থ গ্যারেজে আশ্রয় নেন, তার মাত্র ১০ সেকেন্ড পরই আকাশ থেকে আগুনের গোলার মতো বোমাগুলো ঝরে পড়তে শুরু করে। দুর্ভাগ্যবশত নিহত দুই ব্যক্তি খোলা জায়গায় থাকায় তারা বোমার স্প্লিন্টারের আঘাতে মারাত্মকভাবে জখম হন।
এটিই প্রথম নয়; এর আগে ২০২৫ সালের জুনের যুদ্ধে এবং পরবর্তীতে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরাও ইসরায়েল লক্ষ্য করে অনুরূপ গুচ্ছ বোমা ব্যবহার করেছিল। আন্তর্জাতিক আইনে জনবহুল এলাকায় এই ধরনের অস্ত্রের ব্যবহার নিষিদ্ধ বা অত্যন্ত বিতর্কিত হলেও বর্তমান যুদ্ধে ইরান একে কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। সামরিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ‘আয়রন ডোম’ বা ‘অ্যারো’কে ফাঁকি দিয়ে বড় এলাকা জুড়ে ক্ষয়ক্ষতি নিশ্চিত করতেই তেহরান এই কৌশল অবলম্বন করছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ তাদের নাগরিকদের জন্য সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করেছে। প্রতিটি সাইরেনের শব্দকে গুরুত্ব দিয়ে অন্তত ১০ মিনিট সুরক্ষা কক্ষে অবস্থান করার কড়া নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত যদি আরও দীর্ঘায়িত হয়, তবে আকাশপথে এই ধরনের মারণাস্ত্রের ব্যবহার বেসামরিক নাগরিকদের জন্য এক দীর্ঘস্থায়ী মানবিক সংকট তৈরি করতে পারে।