খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ১১ মার্চ ২০২৬
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে ঘিরে চলমান যুদ্ধে ইরানের রাজধানী তেহরান সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে ভয়াবহ বোমা হামলার এক রাত পার করেছে। রাতভর বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে শহরের বিভিন্ন এলাকা। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে, অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয় এবং হাজারো পরিবার নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে।
এই হামলা বৃহত্তর সামরিক অভিযানের অংশ, যা ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হয়েছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের সামরিক ও কৌশলগত স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যৌথভাবে এই অভিযান পরিচালনা করছে। সামরিক মহলে এই অভিযানের নাম দেওয়া হয়েছে ‘অপারেশন লায়নস রোর’। বিশ্লেষকদের মতে, কয়েক দশকের মধ্যে এটি সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় সরাসরি সংঘাত এবং তা দ্রুতই একটি আঞ্চলিক সংকটে রূপ নিয়েছে।
তেহরানের বিভিন্ন এলাকায় বসবাসকারী মানুষ জানিয়েছেন, সারা রাত ধরে ধারাবাহিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। বিস্ফোরণের তীব্রতায় অনেক জায়গায় ভবনের জানালা কেঁপে ওঠে এবং শকওয়েভ আশপাশের আবাসিক এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।
একজন স্থানীয় বাসিন্দা জানান, সবচেয়ে তীব্র হামলার সময় “মনে হচ্ছিল আমাদের বুক কাঁপছে।” এই মন্তব্য শহরের বহু পরিবারের আতঙ্ক ও অসহায়তার চিত্র তুলে ধরে।
শহরের আকাশে যুদ্ধবিমানের গর্জন, বিমান হামলার সতর্কতা সাইরেন এবং জরুরি সেবার গাড়ির সাইরেন মিলিয়ে পরিস্থিতি এক ধরনের যুদ্ধকালীন পরিবেশ সৃষ্টি করে—যা তেহরান বহু দশক ধরে প্রত্যক্ষ করেনি।
কিছু এলাকায় মানুষ জানালার কাচ ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি কমাতে টেপ লাগিয়ে রাখে। অনেক পরিবার নিরাপদ মনে করে ঘরের করিডর বা বেজমেন্টে আশ্রয় নেয়। একই সঙ্গে তারা টেলিভিশন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিস্থিতির খবরাখবর পর্যবেক্ষণ করতে থাকে।
পশ্চিমা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হামলার লক্ষ্য ছিল ইরানের অস্ত্র কর্মসূচির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সামরিক বা শিল্প স্থাপনা। তবে এসব স্থাপনার কাছাকাছি ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকা থাকায় সাধারণ মানুষও ক্ষতির মুখে পড়েছে।
তেহরানের আশপাশের কয়েকটি তেল ডিপো ও শিল্পকারখানা লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে বলে জানা গেছে। এসব স্থাপনায় আগুন লাগার ফলে আকাশে ঘন কালো ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে। এতে বিষাক্ত গ্যাস ও পরিবেশ দূষণের আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠন ও ইরানি কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বেসামরিক মানুষের ক্ষয়ক্ষতি দ্রুত বাড়ছে। চলমান বোমা হামলা এবং পাল্টা হামলার কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।
| সূচক | আনুমানিক তথ্য |
|---|---|
| ইরানে বেসামরিক নিহত | প্রায় ১২০০–১৩০০ জন |
| আহত বেসামরিক | কয়েক হাজার |
| বড় আকারের হামলা শুরু | ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ |
| ক্ষতিগ্রস্ত প্রধান শহর | তেহরান, তাবরিজসহ অন্যান্য নগর |
বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংঘাতে হাসপাতাল, স্কুল ও আবাসিক ভবনেরও ক্ষতি হয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক মানবিক আইন অনুযায়ী বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
বিমান হামলার প্রভাব রাজধানীর দৈনন্দিন জীবনেও পড়েছে। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও জনসমাগম স্থগিত করা হয়েছে। পাশাপাশি নিরাপত্তাজনিত কারণে কিছু সময়ের জন্য ইন্টারনেট সংযোগ সীমিত করা হয়েছে।
ঝুঁকি এড়াতে অনেক মানুষ শহর ছেড়ে ছোট শহর বা গ্রামাঞ্চলে আশ্রয় নিতে শুরু করেছে। তাদের আশা, সেখানে বিমান হামলার আশঙ্কা তুলনামূলক কম থাকবে। তবে অনেক পরিবার অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা কিংবা বয়স্ক স্বজনদের কারণে তেহরানেই থেকে যেতে বাধ্য হচ্ছে।
তেহরানে এই ব্যাপক হামলা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতকে আরও তীব্র করে তুলেছে। ইরান ইতোমধ্যে পাল্টা হামলার অংশ হিসেবে ইসরাইল ও উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি স্থানে আঘাত হেনেছে বলে খবর পাওয়া গেছে। এতে পুরো অঞ্চলে বড় ধরনের যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
তবে তেহরানের সাধারণ মানুষের কাছে কূটনৈতিক হিসাব-নিকাশের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রতিদিনের নিরাপত্তা ও বেঁচে থাকা। অনেক বাসিন্দাই বলছেন, শহর এখন ভয়ের রাত আর অনিশ্চয়তার দিনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। তাদের একটাই প্রত্যাশা—যেন দ্রুত সহিংসতার অবসান ঘটে এবং একদিন আবার স্বাভাবিক জীবন ফিরে আসে।