খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৫
খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক: লেখক-অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান বলেছেন, ‘আমাদের নতুন করে সংবিধান রচনা করতে হবে, না হলে গণতন্ত্র সফল হবে না। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে পতিত শেখ হাসিনা তো পালিয়ে গেছেন। অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়েছে। এই সরকার তো সংবিধান অনুযায়ী বৈধ নয়। যেহেতু রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রের জনগণ এই সরকারকে সমর্থন করেছে, তার মানে এটি রাষ্ট্র মেনে নিয়েছে; অর্থাৎ ছাত্র-জনতার ঘোষণাপত্র একপ্রকার হয়েই গেছে। শুধু লিখিতভাবে জানানোর প্রয়োজনবোধ মনে করলে সেটি করা বাকিমাত্র। এখন যদি রাষ্ট্র ও বিশ্ববিদ্যালয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা না করতে পারেন, তাহলে আগামী ২০০ বছরে পারবেন কি না, সন্দেহ আছে। এখনই সময় নতুন সংবিধান তৈরি করার।’
বৃহস্পতিবার (৬ ফেব্রুয়ারি) রাতে ‘একাত্মতার দেয়াল’ নামক বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সংগঠনের অভ্যুত্থান–পরবর্তী বিশ্ববিদ্যালয়ের রূপরেখা নিয়ে ‘বিশ্ববিদ্যালয় ও গণতন্ত্র’ শীর্ষক আলোচনা সভায় মুখ্য আলোচকের বক্তৃতায় এ কথা বলেন সলিমুল্লাহ খান। এতে সভাপতিত্বে করেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম সমন্বয়ক সুজয় শুভ।
সলিমুল্লাহ খান বলেন, শিক্ষাব্যবস্থা থেকে শুরু করে ’৭২-এর সংবিধানে অনেক বৈষম্য রয়েছে। সংবিধানে অদ্ভুত অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য তৈরি করে বৈষম্য সৃষ্টি করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা দিয়ে ব্যবসা করে আরও একটি মারাত্মক বৈষম্য সৃষ্টি করেছিল। সম্প্রদায়গত যে সুবিধার কথা বলা হয়েছে, তা স্বাধীনতার ৫৪ বছরেও বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।
সলিমুল্লাহ খান আরও বলেন, ‘শিক্ষাদানে উপযুক্ত প্রতিষ্ঠান তৈরি করা রাষ্ট্রের কর্তব্য। আমাদের দেশে রাষ্ট্র সে কর্তব্য কখনো পূর্ণাঙ্গ পালন করতে পারেনি। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা মৌলিক অধিকারের মধ্যে পড়ে। কিন্তু ১৯৭২ সালে বাংলাদেশে যে সংবিধান গৃহীত হয়েছে, সেখানে একটা চালাকি করেছে। এ জন্য আমরা বলি, এ সংবিধান গণতান্ত্রিক সংবিধান নয়। সেখানে মৌলিক অধিকার বলে যে অধ্যায়টি আছে (তৃতীয় অধ্যায়), তার আগের যে ভাগটা আছে—রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি। সেই কথামতে, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য জনগণের দাবি, কিন্তু জনগণ এই দাবিগুলো বাস্তবায়ন করতে রাষ্ট্রকে বাধ্য করতে পারবে না। কিন্তু জাতিসংঘের ১৯৬৬ সালের যে ঘোষণাপত্রে আমরা স্বাক্ষর করেছি, সেটাতে বলা হয়েছে, শিক্ষার অধিকার আইনগত লভ্য। ’৭২-এর সংবিধান এটা লঙ্ঘন করেছে। এই সংবিধান মৌলিক অধিকারকে নেহাত জনগণের চাহিদা বলে দেখিয়ে দিয়েছে। এটা ভয়ানক ব্যাপার। ’৭২-এর সংবিধান একটি প্রতারণামূলক সংবিধান।’
সর্বক্ষেত্রে বাংলা ভাষাকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে সলিমুল্লাহ খান বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মাধ্যম হবে বাংলা। একমুখী শিক্ষাব্যবস্থা থেকে বের হয়ে শিক্ষাব্যবস্থায় সাম্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে। রাষ্ট্র এখনো বৈষম্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত আছে। শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার মানেই সমাজসংস্কার। শিক্ষাব্যবস্থায় সব স্তরে সাম্য তৈরি করতে হবে। ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা শ্রেণিস্বার্থ না দেখে দেশ ও রাষ্ট্রের স্বার্থের দিকে চিন্তা করে শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কার করতে হবে। সমাজকে নেতৃত্ব দেবে, বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন স্নাতক (গ্র্যাজুয়েট) তৈরি করতে হবে। আমরা অবশ্যই ইংরেজি বা অন্য ভাষা শিখব, কিন্তু তা বাংলা মাধ্যমকে উপেক্ষা করে নয়।’
বাংলা ভাষার বিষয়ে সলিমুল্লাহ খান আরও বলেন, ‘১৯৫৪-এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে একটি দফায় বলা হয়েছিল, বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠা করে সব পরীক্ষা ও সব ক্ষেত্রে বাংলা লিখতে হবে। কিন্তু দেশে কেন সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাংলামাধ্যম ব্যবহার করা হচ্ছে না? আমি আশ্চর্য হই, পতিত শেখ হাসিনা প্রায় ২০ বছর ক্ষমতায় থেকেও ভালোভাবে বাংলা বলতে পারেন না। তাহলে প্রশ্ন থেকে যায়, মাতৃভাষা কতটুকু আমরা গ্রহণ করতে পেরেছি। শ্রেণিবিভাজন সৃষ্টি না করে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাংলামাধ্যম ব্যবহার করতে হবে। তাহলেই শিক্ষা সর্বজনীন ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।’
আলোচনা সভা সঞ্চালনা করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী ভূমিকা সরকার। এতে অন্যান্যের মধ্যে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ মামুন অর রশিদ, বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সঞ্জয় কুমার সরকার, বাংলাদেশ শর্ট ফিল্ম ফোরামের সভাপতি জহিরুল ইসলাম কচি, স্টুডেন্টস অ্যাকটিভিস্ট সাইদুল হক প্রমুখ বক্তব্য দেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন শিক্ষক, কর্মকর্তা ও শিক্ষার্থীরা। প্রশ্নোত্তর পর্বের পর রাত ১১টার দিকে অনুষ্ঠানটি শেষ হয়।
খবরওয়ালা/জেআর