বাংলাদেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনের প্রশংসিত নির্মাতা শাহনেওয়াজ কাকলী বর্তমানে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন। ‘উত্তরের সুর’ ও ‘নদীজন’ চলচ্চিত্রের জন্য সুপরিচিত এই নির্মাতা দীর্ঘদিন ধরে সাভারের সিআরপি (সেন্টার ফর দ্য রিহ্যাবিলিটেশন অব দ্য প্যারালাইজড) হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। গত বছরের অক্টোবরে স্ট্রোক করার পর থেকেই তিনি শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েন এবং ধীরে ধীরে পুনর্বাসন চিকিৎসা নিচ্ছেন।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, স্ট্রোকের পর প্রথমে প্রায় দুই মাস হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন শাহনেওয়াজ কাকলী। এরপর এক মাস বাসায় থাকার পর শারীরিক অবস্থার উন্নতির জন্য আবার তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। বর্তমানে তিনি হাসপাতালের একটি কেবিনে থেকে নিয়মিত থেরাপি নিচ্ছেন।
তার স্বামী প্রাণ রায় জানিয়েছেন, চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী কাকলীর পুনর্বাসন থেরাপি চলছে। মান্না পাপিয়া নামে একজন থেরাপিস্টের অধীনে তার চিকিৎসা পরিচালিত হচ্ছে। তিনি বলেন, “শুরুতে কাকলী চেয়ারে বসেও থাকতে পারত না। এখন অন্তত কিছুক্ষণ বসে থাকতে পারে। এটি আমাদের জন্য আশার বিষয়।”
তবে এখনো স্বাভাবিকভাবে হাঁটা বা চলাফেরা করতে পারছেন না তিনি। হাঁটানোর সময় কোমরে বেল্ট বেঁধে ধরে ধরে হাঁটাতে হয়। প্রাণ রায়ের ভাষায়, “একাই হাঁটা সম্ভব হচ্ছে না। বাম হাত ও বাম পা নিজে থেকে নড়াচড়া করতে পারে না। সহায়তা ছাড়া এগুলো নড়ানো সম্ভব হয় না। ধীরে ধীরে উন্নতি হচ্ছে, তবে সময় লাগবে।”
চিকিৎসকদের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সিআরপির চিকিৎসক ও কর্মীরা অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছেন। “তারা খুব চেষ্টা করছেন। সবার আন্তরিকতা ও ভালোবাসা আমাদের ভরসা জোগাচ্ছে। বাকিটা সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছা।”
শারীরিক দুর্বলতার মাঝেও শাহনেওয়াজ কাকলী ধীরে ধীরে কথা বলার ক্ষমতা ফিরে পাচ্ছেন। শুরুতে কথা বলতে বেশ কষ্ট হলেও এখন তিনি প্রায় ৮০ শতাংশ স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারেন বলে জানিয়েছেন তার স্বামী। এতে পরিবারের সদস্যরা কিছুটা আশাবাদী হয়েছেন।
চিকিৎসা ও বর্তমান অবস্থা
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| অসুস্থতার কারণ | স্ট্রোক |
| স্ট্রোকের সময় | অক্টোবর (গত বছর) |
| চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান | সিআরপি, সাভার |
| থেরাপি তত্ত্বাবধায়ক | মান্না পাপিয়া |
| চলাফেরা | সহায়তা ছাড়া সম্ভব নয় |
| কথা বলার সক্ষমতা | প্রায় ৮০% ফিরে এসেছে |
দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা চালাতে গিয়ে পরিবারের ওপর আর্থিক চাপও বেড়েছে। স্ত্রীকে চিকিৎসা করানোর জন্য নিজের ব্যক্তিগত গাড়ি পর্যন্ত বিক্রি করে দিয়েছেন প্রাণ রায়। তবে এই কঠিন সময়ে বন্ধু, সহকর্মী এবং ঘনিষ্ঠ অনেকেই পাশে দাঁড়িয়েছেন।
বাংলাদেশ অভিনয় শিল্পী সংঘসহ চলচ্চিত্র অঙ্গনের বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠন তাদের সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রাণ রায় নিজেও চারুকলা ইনস্টিটিউটের ছাত্র ছিলেন, সেখানকার সহপাঠী ও পরিচিত অনেকেই সহযোগিতা করছেন।
তিনি বলেন, “যারা এই কঠিন সময়ে আমাদের পাশে আছেন, তাদের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ। তাদের ভালোবাসা ও সহমর্মিতা আমাদের সাহস দিচ্ছে।”
সরকারি সহায়তার বিষয়েও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। তার মতে, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত একজন নির্মাতা হিসেবে শাহনেওয়াজ কাকলী দেশের সাংস্কৃতিক সম্পদ। তাই সরকারের পক্ষ থেকে সহায়তা পাওয়া গেলে চিকিৎসা চালিয়ে যেতে আরও সুবিধা হবে।
উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র ও অর্জন
| চলচ্চিত্র | বিশেষ অর্জন |
|---|---|
| উত্তরের সুর | কাহিনীকার হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার |
| নদীজন | এই চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য তমা মির্জার জাতীয় পুরস্কার |
| ফ্রম বাংলাদেশ | নির্মাণাধীন, অর্থাভাবে আংশিক কাজ বাকি |
শাহনেওয়াজ কাকলী সর্বশেষ ‘ফ্রম বাংলাদেশ’ নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু করেছিলেন। তবে অর্থ সংকটের কারণে ছবিটির প্রায় ১০ শতাংশ কাজ এখনো বাকি রয়েছে। তার সুস্থতা ফিরলে এই কাজ সম্পন্ন করার আশা প্রকাশ করেছেন পরিবার ও সহকর্মীরা।
বাংলাদেশের স্বাধীনধারা চলচ্চিত্রে বাস্তবধর্মী গল্প ও মানবিক বিষয় তুলে ধরার জন্য শাহনেওয়াজ কাকলী বিশেষভাবে পরিচিত। তার নির্মিত ‘উত্তরের সুর’ ও ‘নদীজন’ দর্শক ও সমালোচকদের কাছ থেকে ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করেছিল।
পরিবারের পক্ষ থেকে সবার কাছে দোয়া ও শুভকামনা চাওয়া হয়েছে। প্রাণ রায় বলেন, “সবাই যেন কাকলীর জন্য প্রার্থনা করেন। আমরা চাই তিনি আবার সুস্থ হয়ে আগের মতো কাজে ফিরতে পারেন।”