খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ১৫ মার্চ ২০২৬
স্মৃতিতে অম্লান
শিল্পী বেদার উদ্দিন আহমেদ
বাংলা সঙ্গীতাঙ্গনের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, বিশিষ্ট নজরুলসংগীত শিল্পী ও বাংলাদেশ বুলবুল ললিতকলা একাডেমি (বাফা)-এর সাবেক অধ্যক্ষ বেদার উদ্দিন আহমেদ আজও সঙ্গীতপ্রেমীদের স্মৃতিতে অম্লান হয়ে আছেন। তাঁর কণ্ঠ, সাধনা এবং সাংস্কৃতিক নেতৃত্ব বাংলা সঙ্গীতের ইতিহাসে বিশেষ মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত।
বেদার উদ্দিন আহমেদের জন্ম ১৫ মার্চ ১৯২৭ সালে বগুড়া জেলার শেরপুর সদরে। তাঁর পিতার নাম মহিরউদ্দিন আহমেদ এবং মাতার নাম নেকজাহান বেওয়া। শৈশবেই তিনি পিতৃহারা হন। সংসারের নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তাঁর সাংস্কৃতিক বিকাশের বীজ রোপিত হয় মায়ের কাছ থেকেই। মায়ের কণ্ঠে ইসলামি গান শুনতে শুনতেই সঙ্গীতের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ জন্ম নেয়।
১৯৪২ সালে তিনি তৎকালীন তথ্য ও পাবলিসিটি বিভাগে চাকরিতে যোগদান করেন। একই সময়ে তাঁর সঙ্গীত প্রতিভা দ্রুত বিকশিত হতে থাকে। কলকাতার বিখ্যাত গ্রামোফোন কোম্পানি কলম্বিয়া ও এইচএমভি থেকে তাঁর গানের রেকর্ড প্রকাশিত হলে তিনি সঙ্গীতাঙ্গনে বিশেষ পরিচিতি লাভ করেন। সেই সময় কলকাতা বেতার কেন্দ্র থেকেও তিনি নিয়মিত সঙ্গীত পরিবেশন করতেন, যা তাঁকে আরও জনপ্রিয় করে তোলে।
১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের পর তিনি ঢাকায় চলে আসেন এবং তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান বেতারে সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে যোগ দেন। ঢাকায় তাঁর শিল্পীজীবন আরও বিস্তৃত হয়। দেশাত্মবোধক গান ও নজরুলসংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে তিনি শ্রোতাদের হৃদয়ে বিশেষ স্থান করে নেন।
বেদার উদ্দিন আহমেদ ছিলেন কিংবদন্তি ভাওয়াইয়া শিল্পী আব্বাসউদ্দীনের সহশিল্পী ও সম্পূরক কণ্ঠশিল্পী হিসেবে সুপরিচিত। পঞ্চাশের দশকে নবগঠিত পূর্ব পাকিস্তানের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তিনি এক নবজাগরণের প্রতীক হয়ে ওঠেন। বাংলার শহর-বন্দর-গ্রাম—সবখানেই বিভিন্ন সঙ্গীতসভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে দেশাত্মবোধক গান ও নজরুলসংগীত পরিবেশন করে তিনি শ্রোতাদের মুগ্ধ করতেন।
শুধু গায়ক হিসেবেই নয়, সাংস্কৃতিক সংগঠক হিসেবেও তাঁর অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। বুলবুল ললিতকলা একাডেমি (বাফা)-এর অধ্যক্ষ হিসেবে তিনি সঙ্গীতশিক্ষা বিস্তার ও সাংস্কৃতিক চর্চা প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
সঙ্গীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ১৯৭৪ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার এবং ১৯৮০ সালে দেশের অন্যতম সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদক লাভ করেন।
জাতীয় সাংস্কৃতিক জাগরণে শিল্পী বেদার উদ্দিন আহমেদের অবদান অনস্বীকার্য। তাঁর কণ্ঠ, তাঁর সাধনা এবং তাঁর সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি আজও বাংলা সঙ্গীতকে অনুপ্রাণিত করে।
১৯৯৮ সালের ১৩ জানুয়ারি এই বিশিষ্ট সঙ্গীতশিল্পী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কিন্তু তাঁর সুর, তাঁর অবদান এবং তাঁর স্মৃতি আজও বাংলা সংস্কৃতির আকাশে দীপ্তিমান।
শ্রদ্ধাভরে স্মরণ।