খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ১৮ মার্চ ২০২৬
আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যে গত প্রায় ছয় মাস ধরে চলমান সংঘাত ক্রমেই তীব্র রূপ নিচ্ছে। আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ ঘোষণা না হলেও বাস্তবে দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মধ্যে একধরনের নীরব যুদ্ধ পরিস্থিতি বিরাজ করছে। বিশেষ করে আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলে পাকিস্তানের বিমান হামলা এবং পাল্টা হিসেবে সীমান্তবর্তী অঞ্চলে আফগান তালেবান সরকারের আক্রমণ এই উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে কাবুলের একটি মাদকাসক্ত পুনর্বাসনকেন্দ্রে হামলার ঘটনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তেমন গুরুত্ব না পেলেও এর রাজনৈতিক তাৎপর্য গভীর। পাকিস্তান দাবি করেছে, তারা কোনো হাসপাতাল নয়, বরং আত্মঘাতী হামলার প্রশিক্ষণকেন্দ্রে আঘাত হেনেছে। অন্যদিকে আফগানিস্তান একে বেসামরিক নাগরিকদের ওপর আক্রমণ হিসেবে তুলে ধরছে। এই ধরনের দ্বৈত বয়ান বর্তমান সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলেছে, যেখানে সত্য-মিথ্যা নির্ধারণ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
ঐতিহাসিকভাবে দেখা যায়, বহিরাগত শক্তির বিরুদ্ধে আফগান ও পাকিস্তানের সীমান্তবর্তী জনগোষ্ঠী একত্রে প্রতিরোধ গড়ে তুললেও বর্তমানে তারা নিজেদের মধ্যেই সংঘাতে জড়িয়েছে। এর পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে দীর্ঘদিনের বিতর্কিত ডুরান্ড রেখাকে দায়ী করা হয়। তবে এই সীমান্ত বিরোধ নতুন নয়; বরং প্রশ্ন ওঠে কেন নির্দিষ্ট সময়েই এই সংঘাত তীব্র হয়ে ওঠে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান উত্তেজনার পেছনে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ায় পুনরায় প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টা এই সংঘাতকে উসকে দিতে পারে। আফগানিস্তানে পুনরায় সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের সম্ভাবনা এবং তা ঘিরে ভূরাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
অন্যদিকে পাকিস্তানের জন্য নিরাপত্তা একটি বড় উদ্বেগ। তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান নামের সংগঠনের ক্রমবর্ধমান হামলা দেশটির অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলছে। এই প্রেক্ষাপটে সীমান্তে সামরিক অভিযান চালিয়ে পাকিস্তান একদিকে যেমন নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায়, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ জনমতও নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়।
আফগানিস্তানের অবস্থানও সমানভাবে জটিল। দেশটির সরকার একদিকে টিটিপি যোদ্ধাদের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না, অন্যদিকে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিলে নিজস্ব আদর্শগত ভিত্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে এই গোষ্ঠীগুলো অনেকাংশে একটি কৌশলগত চাপ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে ধারণা করা হয়।
নিচের সারণিতে সাম্প্রতিক সংঘাতের প্রধান উপাদানগুলো তুলে ধরা হলো—
| উপাদান | বিবরণ |
|---|---|
| সীমান্ত বিরোধ | ডুরান্ড রেখা নিয়ে দীর্ঘদিনের মতবিরোধ |
| নিরাপত্তা ইস্যু | টিটিপি হামলা ও সন্ত্রাসবাদ |
| আন্তর্জাতিক প্রভাব | যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য ভূরাজনৈতিক কৌশল |
| কৌশলগত লক্ষ্য | আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা |
| আদর্শগত দ্বন্দ্ব | ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থা বনাম রাষ্ট্রীয় নীতি |
সব মিলিয়ে আফগানিস্তান-পাকিস্তান সংঘাত কেবল সীমান্ত বিরোধ নয়; বরং এর গভীরে রয়েছে আঞ্চলিক আধিপত্যের লড়াই, আদর্শগত দ্বন্দ্ব এবং বৈশ্বিক শক্তির প্রভাব। বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে এই সংঘাত ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত আকার ধারণ করতে পারে, যা পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্য গুরুতর হুমকি হয়ে উঠতে পারে।