খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ২৩ মার্চ ২০২৬
‘আমার পছন্দ, আমার দেশ’—এই স্লোগানটি তেহরানের কেন্দ্রে ভালিআসর স্কয়ারে উঁচু বিলবোর্ডে ঝলমল করছিল। ইরানের জাতীয় টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচারিত অনুষ্ঠানে দেশের নারী ফুটবল দল সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে ছিলেন। পাশে সরকারি কর্মকর্তারা, এবং পতাকাবাহী জনগণ উদ্দীপনার সঙ্গে তাঁদের বীরত্বপূর্ণ অভ্যর্থনা জানাচ্ছিল।
ইরানের নারী দল, ইংল্যান্ড জাতীয় দলের মতো, ‘লায়নেস’ নামে পরিচিত। অস্ট্রেলিয়ায় আয়োজিত নারী এশিয়ান কাপের তিন ম্যাচে ইরান হেরে গেলেও, দেশ প্রত্যাবর্তনের এই মুহূর্ত ছিল বড় জয়। মাত্র কয়েক দিন আগে দলের অধিনায়ক ও পাঁচ খেলোয়াড় ব্রিসবেনে একটি সেফ হাউসে ছিলেন এবং দেশত্যাগের পরিকল্পনা করছিলেন। শেষ পর্যন্ত দুজনই সেখানে থেকে যান।
ইরান ফুটবল ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট মেহেদি তাজ বলেন, “এই খেলোয়াড়রা তাদের মাতৃভূমি, পতাকা এবং বিপ্লবের প্রতি অনুগত।” জার্সি ও বাধ্যতামূলক কালো হিজাব পরা অবস্থায় নারী ফুটবলাররা জাতীয় সংগীত পরিবেশন করেন। কিন্তু ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টাইমস জানায়, খেলোয়াড়দের মুখে ছিল বিষণ্নতা—মনে হচ্ছিল, তারা জানে না তাদের ভাগ্য কী হবে।
তিন সপ্তাহ আগে নারী এশিয়ান কাপের উদ্বোধনী ম্যাচে জাতীয় সংগীতের সময় চুপ থাকায় রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন তাদের ‘যুদ্ধকালীন বিশ্বাসঘাতক’ আখ্যা দিয়েছিল। সেইদিন সকালেই ১৯ বছর বয়সী কুস্তিগির সালেহ মোহাম্মদিসহ আরও দুই তরুণের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়, গত জানুয়ারির বিক্ষোভে অংশগ্রহণের কারণে। দ্য টাইমসের ধারণা, ওই বিক্ষোভে অন্তত ৩০ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন।
ইরানের নারী দলের অনেক সদস্য বয়স মাত্র ২১ বছরের নিচে। তাদের সামনে দুটি পথ—একটি দেশে থেকে দমন ও যুদ্ধের মুখোমুখি হওয়া, অন্যটি রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করা, যা পরিবারকে বিপদের মুখে ফেলে। সাবেক জাতীয় খেলোয়াড় মোহাম্মদ তাগভি বলেন, “যদি বোঝে আপনার দুর্বলতা পরিবার, সেটিকেই তারা অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করবে। এই মেয়েরা শিশু; তাদের মনের অবস্থা কল্পনা করুন।”
নারীরা আগে স্টেডিয়ামে খেলা দেখতে পারতেন না। ২০১৯ সালে সাহার খোদায়ারি ‘ব্লু গার্ল’ হিসেবে পরিচিত এক তরুণী আজাদি স্টেডিয়ামে প্রবেশের চেষ্টা করলে গ্রেপ্তার হন এবং পরে মৃত্যু হয়।
ফিফার নিয়ম অনুযায়ী, নারী দর্শক ও জাতীয় নারী দল থাকা বাধ্যতামূলক। না হলে পুরুষ দলও বিশ্বকাপের মতো আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে অংশ নিতে পারবে না। ইরানও ২০২৬ বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার যোগ্যতা রাখে, কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে নিশ্চিত নয়।
| তারিখ | ঘটনা | অবস্থান |
|---|---|---|
| ২ মার্চ ২০২৬ | নারী এশিয়ান কাপ উদ্বোধনী ম্যাচ | গোল্ড কোস্ট, অস্ট্রেলিয়া |
| ২-৪ মার্চ | জাতীয় সংগীতের সময় খেলোয়াড়রা চুপ ছিলেন | হোটেল ও স্টেডিয়াম |
| ৫ মার্চ | কিছু খেলোয়াড় ব্রিসবেনে আশ্রয় গ্রহণ | সেফ হাউস, ব্রিসবেন |
| ৭ মার্চ | দলের বাকিরা মালয়েশিয়া ফ্লাইটে প্রেরণ | কুয়ালালামপুর |
অস্ট্রেলিয়ায় নিরাপদ স্থানে থাকা সত্ত্বেও, পরিস্থিতি বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তোলে। স্থানীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে আশ্রয় চাওয়ার প্রচেষ্টা ও ইরান সরকারের প্রতিক্রিয়া বিষয়টি তীব্র বিতর্কের জন্ম দেয়।
শেষ পর্যন্ত মাত্র দুজন খেলোয়াড়ই অস্ট্রেলিয়ায় থাকেন—৩৪ বছর বয়সী আতেফে রামাজানজাদেহ এবং ২১ বছর বয়সী ফাতেমেহ পাসানদিদেহ। অন্যরা দেশে ফিরে যান। সোয়ানসবোরো জানিয়েছেন, “এখানে আসলে কেউ জেতেননি। প্রত্যেকেরই জীবন কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি।”
ইরান নারী ফুটবল দলের এই সাহসী যাত্রা কেবল খেলাধুলা নয়, স্বাধীনতা, মানবাধিকার ও আত্মপরিচয়ের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।