খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: 16শে চৈত্র ১৪৩২ | ৩০ই মার্চ ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষকরা উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে পেঁয়াজ বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। বিশেষ করে মুড়িকাটা পেঁয়াজ উঠার মৌসুমের শেষ দিকে বাজারদর হঠাৎ কমে যাওয়ায় কৃষকের ক্ষতি আরও বাড়ছে। উৎপাদন বৃদ্ধি, সংরক্ষণাগারের অভাব ও নগদ টাকার তাগিদ—এই তিনটি প্রধান কারণের ফলে লোকসান নিয়েই বিক্রি করতে হচ্ছে।
রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার কৃষক আল-আমিন ১০ কাঠা জমিতে মুড়িকাটা পেঁয়াজ আবাদ করে প্রায় ৩৫ মণ পেয়েছেন। উৎপাদনে খরচ হয়েছে প্রতি মণে প্রায় এক হাজার ৩০০ টাকা, কিন্তু বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকায়। এতে প্রতি কেজির দাম দাঁড়াচ্ছে প্রায় ১০ টাকা। আল-আমিন বলেন, সংরক্ষণ করার সুবিধা নেই, তাই লোকসান সহ্য করে বিক্রি করতে হচ্ছে।
পাবনার সুজানগরের কৃষক আবু বকরও একই সমস্যার মুখোমুখি। তার উৎপাদন খরচ বিঘাপ্রতি প্রায় ৮০ হাজার টাকা, মণপ্রতি খরচ ১,৪০০–১,৫০০ টাকা। পাইকারি বাজারে মণপ্রতি দামে তিনি পাচ্ছেন ৬০০–১,০০০ টাকা, খুচরা পর্যায়ে কেজিপ্রতি বিক্রি হচ্ছে ১৫–২০ টাকায়।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে দেশের মোট প্রায় তিন লাখ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ আবাদ হয়, যা থেকে উৎপাদন হয় ৪৪ লাখ ৪৮ হাজার ৭০০ টন। ২০২৫–২৬ অর্থবছরে তিন লাখ হেক্টরের বেশি জমিতে চাষ হলেও এর মধ্যে প্রায় ২৫ শতাংশ পণ্যই তোলা হয়েছে।
পাবনা জেলার উৎপাদন ও বাজার পরিস্থিতি নিম্নে দেখানো হলো:
| জেলা | আবাদ জমি (হেক্টর) | লক্ষ্যমাত্রা উৎপাদন (টন) | বাস্তব উৎপাদন (টন) | উৎপাদন খরচ (কেজি) | বাজারদর (কেজি) |
|---|---|---|---|---|---|
| পাবনা | ৮,০০০+ | ১,৪২,৩১৫ | ১,৫০,০০০ | ৩০ টাকা | ২০ টাকা |
কৃষি কর্মকর্তারা জানাচ্ছেন, অনেক কৃষক সার, বীজ ও কীটনাশক কিস্তিতে কিনে থাকেন। ঋণ পরিশোধের চাপেই তারা লোকসান সহ্য করে দ্রুত পণ্য বিক্রি করেন। দুর্গাপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাহানা পারভীন লাবনী বলেন, সংরক্ষণ সুবিধা থাকলেও নগদ টাকার প্রয়োজনের কারণে কৃষকরা পেঁয়াজ ধরে রাখতে পারেন না।
মৌসুমের শুরুতে দাম তুলনামূলক বেশি থাকে, ডিসেম্বরের শুরুতে খুচরা বাজারে কেজি ১৩০–১৫০ টাকা হলেও, মার্চে তা কমে ৪৫–৫০ টাকায় নেমে আসে। ফলে উৎপাদন খরচের তুলনায় বিক্রয়মূল্য অনেক কমে যায়।
কৃষিবিদরা মনে করেন, যদি সংরক্ষণ ও বাজার ব্যবস্থাপনা উন্নত করা যায়, কৃষকের ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। ড. মোহা. মাসুদুল হক ঝন্টু বলেন, “যদি কৃষক অন্তত ৪০ দিন পেঁয়াজ সংরক্ষণ করতে পারেন, তাহলে পরে ভালো দাম পেতে পারেন। তবে শিলাবৃষ্টির কারণে অনেক অঞ্চলে পেঁয়াজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে সংরক্ষণ সম্ভব নয়।”
দেশে উৎপাদন বাড়লেও সংরক্ষণ ও বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে কৃষক ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। এ অবস্থায় কৃষিবিদরা আমদানি নিয়ন্ত্রণ ও আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর জোর দিচ্ছেন।
মোটকথা, উৎপাদন বেশি হলেও সংরক্ষণ ও বাজার ব্যবস্থাপনার অভাবে দেশের কৃষকরা লোকসান ভেঙে পেঁয়াজ বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।