খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬
বাংলা চলচ্চিত্রের সোনালি যুগের অন্যতম শীর্ষ ও জনপ্রিয় অভিনেত্রী শাবানার জন্মদিন আজ ১৫ জুন (সোমবার)। এই গুণী ও কিংবদন্তি অভিনেত্রী আজ ৭৫ বছর বয়সে পদার্পণ করলেন। তিনি তাঁর সুদীর্ঘ কর্মজীবনে অসাধারণ অভিনয়শৈলী প্রদর্শন করে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এ দেশের চলচ্চিত্রপ্রেমী দর্শকদের মুগ্ধ করে রেখেছেন।
১৯৫২ সালের ১৫ জুন চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার ডাবুয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এই গুণী শিল্পী। তাঁর পারিবারিক ও প্রকৃত নাম আফরোজা সুলতানা রত্না। প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা এহতেশাম হায়দার চৌধুরীর হাত ধরে চলচ্চিত্রে নায়িকা হিসেবে তাঁর অভিষেক ঘটে এবং সেই সময়েই তাঁর নাম পরিবর্তন করে ‘শাবানা’ রাখা হয়। পরবর্তীকালে এই নামেই তিনি বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় ও গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় রচনা করেন।
শাবানার চলচ্চিত্রের পথচলা শুরু হয়েছিল অত্যন্ত শিশু বয়সে। ১৯৬২ সালে প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার এহতেশাম পরিচালিত ‘নতুন সুর’ সিনেমায় তিনি প্রথমবার শিশুশিল্পী হিসেবে ক্যামেরার সামনে দাঁড়ান। এর ঠিক পাঁচ বছর পর, ১৯৬৭ সালে উর্দু ভাষার ‘চকোরী’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে নায়িকা হিসেবে তাঁর অভিষেক ঘটে। প্রথম সিনেমাতেই চমৎকার অভিনয় উপহার দিয়ে তিনি দর্শক ও সমালোচকদের ভূয়সী প্রশংসা অর্জন করেন এবং রাতারাতি তারকাখ্যাতি লাভ করেন।
দীর্ঘ প্রায় ৩৬ বছরের সুদীর্ঘ কর্মজীবনে শাবানা মোট ২৯৯টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। এর মধ্যে ঢালিউডের ইতিহাসের বহু কালজয়ী সিনেমা রয়েছে। তিনি সামাজিক, পারিবারিক, অ্যাকশন ও রোমান্টিকসহ বিভিন্ন ধারার চলচ্চিত্রে বৈচিত্র্যময় চরিত্রে অভিনয় করে নিজের বহুমুখী প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন।
অভিনয়জীবনে শাবানা তৎকালীন সময়ের প্রায় সব শীর্ষ নায়কের সঙ্গেই জুটি বেঁধে সফল ও ব্যবসায়িক সফল সিনেমা উপহার দিয়েছেন। বিশেষ করে নায়ক আলমগীরের সঙ্গে তাঁর জুটি ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয়। তাঁরা দুজনে একসঙ্গে রেকর্ডসংখ্যক ১৩০টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। এছাড়া নায়ক রাজ্জাক, ওয়াসিম ও উজ্জ্বলের সঙ্গেও তাঁর জুটি ব্যাপক দর্শকপ্রিয়তা লাভ করে। শুধু দেশীয় চলচ্চিত্রেই নয়, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও তাঁর কাজের পরিধি বিস্তৃত ছিল। পাকিস্তানি চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় নায়ক নাদিমের বিপরীতেও তিনি অভিনয় করেছেন এবং সেই সিনেমাগুলো দর্শকরা বেশ পছন্দ করেছিলেন।
অভিনেত্রী শাবানার উল্লেখযোগ্য কিছু চলচ্চিত্রের তালিকা নিচে টেবিল আকারে প্রকাশ করা হলো:
| চলচ্চিত্রের নাম | সহশিল্পী/বিশেষত্ব | চলচ্চিত্রের নাম | সহশিল্পী/বিশেষত্ব |
| ‘নতুন সুর’ (১৯৬২) | শিশুশিল্পী হিসেবে প্রথম কাজ | ‘ওরা ১১ জন’ (১৯৭২) | মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র |
| ‘চকোরী’ (১৯৬৭) | নায়িকা হিসেবে অভিষেক | ‘মধু মিলন’ | পারিবারিক/সামাজিক |
| ‘অবুঝ মন’ | রোমান্টিক/সামাজিক | ‘ভাত দে’ | জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত কালজয়ী সিনেমা |
| ‘ছুটির ঘণ্টা’ | বাস্তবধর্মী সামাজিক সিনেমা | ‘ছুটি’ / ‘রাঙা ভাবী’ | পারিবারিক টানাপোড়েন |
| ‘দুই পয়সার আলতা’ | গ্রামীণ পটভূমি | ‘মা ও ছেলে’ | মাতৃত্ব ও পারিবারিক মূল্যবোধ |
| ‘স্বামী স্ত্রী’ | দাম্পত্য জীবনভিত্তিক | ‘চাঁপা ডাঙ্গার বউ’ | সাহিত্যনির্ভর চলচ্চিত্র |
ব্যক্তিগত জীবনে ১৯৭৩ সালে চলচ্চিত্র প্রযোজক ও পরিচালক ওয়াহিদ সাদিকের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন শাবানা। দাম্পত্য জীবনে তাঁরা দুই কন্যা ও এক পুত্রসন্তানের পিতা-মাতা। অভিনয়জীবনের জনপ্রিয়তার একদম শীর্ষে থাকা অবস্থায়, ২০০০ সালে এই কিংবদন্তি অভিনেত্রী হুট করেই চলচ্চিত্র অঙ্গন থেকে বিদায় নেন এবং সপরিবারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। প্রবাস জীবনের শুরুর দিকে তিনি নিউইয়র্কে বসবাস করলেও, বর্তমানে স্বামী, সন্তান এবং নাতি-নাতনিদের নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। রূপালি পর্দা থেকে দীর্ঘ সময় দূরে থাকলেও আজ অবধি তিনি বাংলা চলচ্চিত্রের দর্শকদের হৃদয়ে এক অনন্য আসনে অধিষ্ঠিত আছেন।