খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ৩০ মার্চ ২০২৬
দেশে টিকার সংকট তীব্র আকার নিয়েছে। কেন্দ্রীয় গুদামে দশটি রোগের টিকার মজুত বর্তমানে শূন্যে নেমেছে। এর প্রভাব বিশেষভাবে শিশুদের উপর পড়ছে। চলতি মাসে দেশে হামে আক্রান্ত হয়ে অন্তত ৪১ শিশুর মৃত্যু ঘটেছে। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি এবং সরকারি হাসপাতাল সূত্রে এ তথ্য নিশ্চিত হয়েছে।
সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, টিকা সংগ্রহে জটিলতা ও প্রশাসনিক বিলম্বের কারণে কেন্দ্রীয় গুদামে মজুত শেষ হয়ে গেছে। পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে টিকার স্বল্পতা এবং জনবল ঘাটতির কারণে শিশু ও মায়েরা যথাযথভাবে টিকা গ্রহণ করতে পারছেন না। ফলে শিশুদের মধ্যে হামের সংক্রমণ বাড়ছে, যা অন্য রোগের বিস্তারেও সহায়ক হচ্ছে।
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে টিকাদানে সফল দেশ হিসেবে পরিচিত। নিয়মিত টিকাদান এবং জাতীয় ক্যাম্পেইনগুলোর মাধ্যমে পোলিও নির্মূল করা সম্ভব হয়েছে, ধনুষ্টংকার নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়েছে এবং হেপাটাইটিস নিয়ন্ত্রণে এসেছে। ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে হামকে শূন্যের কোঠায় নামানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে, গাফিলতির কারণে এই সফল কর্মসূচি ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, ‘আট বছর আগে শেষবার হামের টিকা দেওয়া হয়েছিল। এরপর আর দেওয়া হয়নি। আমরা ইতিমধ্যে ৬০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছি। যথাসময়ে টিকা সংগ্রহ করে বিতরণ শুরু করা হবে।’ তিনি আরও বলেন, সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে ভেন্টিলেটরসহ আইসিইউ প্রস্তুত রাখা হয়েছে। রাজধানীর শিশু হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মানিকগঞ্জ ও উত্তরাঞ্চলের হাসপাতালগুলোতেও হাম মোকাবিলায় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
| টিকার নাম | রোগ প্রতিরোধ | কেন্দ্রীয় গুদামের মজুত |
|---|---|---|
| বিসিজি | যক্ষ্মা | শূন্য |
| পেন্টা | ডিপথেরিয়া, পার্টুসিস, ধনুষ্টংকার, হিমোফিলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা টাইপ-বি, হেপাটাইটিস-বি | শূন্য |
| বিওপিভি | পোলিও | শূন্য |
| পিসিভি | নিউমোনিয়া | শূন্য |
| এমআর | হাম, রুবেলা | শূন্য |
| টিডি | ধনুষ্টংকার, ডিপথেরিয়া | শূন্য |
| আইপিভি | পোলিও | জুন পর্যন্ত পর্যাপ্ত |
| টিসিভি | টাইফয়েড | জুন পর্যন্ত পর্যাপ্ত |
| এইচপিভি | জরায়ুমুখের ক্যানসার | ডিসেম্বর পর্যন্ত পর্যাপ্ত |
দেশে টিকা দেওয়া হয় মূলত দুটি ধাপে। নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে সারা বছর চলে। এছাড়া জাতীয় ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট বয়সের সব শিশুকে দ্রুত টিকার আওতায় আনা হয়। জাতীয় ভিটামিন-এ ক্যাম্পেইনও এই সময় সংগঠিত হয়।
তবে টিকার স্বল্পতা ছাড়াও জনবল ঘাটতির সমস্যা প্রকট। দেশের ২৭ জেলায় স্বাস্থ্য সহকারী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, কিন্তু বাকি ৩৭ জেলায় ৪৫ শতাংশ কর্মী অনুপস্থিত। এছাড়া টিকাকর্মীদের বেতনবৈষম্য, কর্মবিরতি ও স্থানীয় অসন্তোষও টিকাদানকে প্রভাবিত করছে।
সম্প্রতি ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ, সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে হামে আক্রান্ত শিশুর মৃত্যুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। চলতি মাসে ৪১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেন, ‘এত শিশুর মৃত্যু অত্যন্ত দুঃখজনক। এর জন্য স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরাই দায়ী। টিকা কেন ফুরালো এবং শিশুরা কেন মারা গেল—এ বিষয়ে জরুরি অনুসন্ধান ও তদন্ত প্রয়োজন।’
সংক্ষেপে, টিকা সংকট, জনবল ঘাটতি এবং প্রশাসনিক বিলম্ব একত্রে শিশুদের স্বাস্থ্যকে হুমকির মুখে ফেলেছে। দেশের টিকাদান কর্মসূচির সফল ইতিহাসকে পুনরায় ঝুঁকির মধ্যে ফেলা এ পরিস্থিতি চরম সতর্কতার প্রয়োজন।