ইসরায়েলে ফিলিস্তিনিদের মৃত্যুদণ্ড বিল পাস: মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন

ফিলিস্তিনি জনগণের ওপর দমন-পীড়ন আরও তীব্র করতে এক বিতর্কিত ও কঠোর আইন পাস করেছে ইসরায়েলের পার্লামেন্ট বা নেসেট। নতুন এই আইনের অধীনে ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে’ জড়িত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত ফিলিস্তিনিদের মৃত্যুদণ্ড প্রদানের বিধান রাখা হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই পদক্ষেপকে রাষ্ট্রীয় মদতে ‘পরিকল্পিত হত্যা’ এবং আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন হিসেবে অভিহিত করেছে। মিডল ইস্ট আই-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইনটি পাসের পর থেকে বিশ্বজুড়ে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে।

আইনের বৈষম্যমূলক কাঠামো ও প্রয়োগ

সোমবার পাস হওয়া এই আইনের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো এর দ্বিমুখী প্রয়োগ ব্যবস্থা। আইনটিতে জাতীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে শাস্তির দুটি পৃথক পথ নির্ধারণ করা হয়েছে। বিশেষ করে অধিকৃত পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিদের জন্য এটি একটি মরণফাঁদ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

  • সামরিক আদালতের প্রভাব: পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিদের বিচার সাধারণত ইসরায়েলি সামরিক আদালতে সম্পন্ন হয়। নতুন আইনের ফলে এসব আদালতে অভিযুক্ত ফিলিস্তিনিদের জন্য মৃত্যুদণ্ডই হবে একমাত্র পূর্বনির্ধারিত বা বাধ্যতামূলক শাস্তি।

  • নির্বিচারে লক্ষ্যবস্তু: ফিলিস্তিনি আইনি সংস্থা ‘আদালাহ’-এর লিগ্যাল ডিরেক্টর সুহাদ বিশারা এক বিবৃতিতে বলেন, “এই আইনটি এমন এক রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রতিফলন যা কোনো সুনির্দিষ্ট হুমকি ছাড়াই নিরপরাধ বা রাজনৈতিক কারণে বন্দি ব্যক্তিদের ঠাণ্ডা মাথায় হত্যার বৈধতা দিচ্ছে।” তিনি আরও যোগ করেন যে, এটি মূলত বর্ণবৈষম্য বা অ্যাপার্থাইড নীতির একটি আধুনিক সংস্করণ।

আইনি ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট

ইসরায়েলের প্রধান মানবাধিকার সংগঠন ‘অ্যাসোসিয়েশন ফর সিভিল রাইটস ইন ইসরায়েল’ এই আইনের বিরুদ্ধে সরব হয়েছে। তারা দুটি প্রধান যুক্তি উত্থাপন করেছে: ১. এখতিয়ার বহির্ভূত পদক্ষেপ: আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, পশ্চিম তীর একটি অধিকৃত অঞ্চল। ১৯৬৭ সাল থেকে এটি ইসরায়েলি দখলে থাকলেও সেখানে ইসরায়েলি পার্লামেন্টের আইন প্রণয়নের কোনো সার্বভৌম অধিকার নেই। ২. অসাংবিধানিক চরিত্র: এই আইনটি মানবাধিকার, মানব মর্যাদা এবং ন্যায্য বিচারের মৌলিক নীতির পরিপন্থী, যা ইসরায়েলের নিজস্ব কিছু ‘বেসিক ল’ বা মৌলিক আইনের সাথেও সাংঘর্ষিক।

নিচে এই আইনের প্রধান দিকগুলো টেবিলের মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:

বিষয়ের নাম আইনের প্রভাব ও বিবরণ
মূল লক্ষ্যবস্তু মূলত অধিকৃত পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনি অধিবাসী।
বিচারের ধরন সামরিক আদালতের মাধ্যমে দ্রুত বিচার ও শাস্তি কার্যকর।
বৈষম্য একই অপরাধে ইসরায়েলি নাগরিকরা সাধারণত এই আইনের আওতামুক্ত।
গোপনীয়তা গোপনে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর এবং বন্দিদের বিচ্ছিন্ন রাখার অনুমতি।
আন্তর্জাতিক অবস্থান চতুর্থ জেনেভা কনভেনশন ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের লঙ্ঘন।

একটি অন্ধকার ভবিষ্যতের ইঙ্গিত

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই আইনটি কেবল শাস্তির মাধ্যম নয়, বরং পশ্চিম তীরকে আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েলের সাথে একীভূত করার একটি রাজনৈতিক কৌশল। আইনটিতে এমন বিধান রয়েছে যেখানে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিদের দীর্ঘ সময় সম্পূর্ণ নির্জন কারাবাসে রাখা এবং জনসমক্ষ এড়িয়ে গোপনে ফাঁসি কার্যকর করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

ইসরায়েলের সুপ্রিম কোর্টে এই আইনের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে আপিল করার পরিকল্পনা করেছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই পদক্ষেপকে ফিলিস্তিনিদের কণ্ঠরোধ করার একটি হাতিয়ার হিসেবে দেখছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটকে আরও ঘনীভূত করবে। দখলদার শক্তির এমন কঠোর অবস্থান দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রক্রিয়ার পথে এক বিশাল অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।