বাংলাদেশের জীবনবীমা খাতে দীর্ঘদিন ধরে চলমান আর্থিক সংকট ও ব্যবস্থাপনা দুর্বলতার কারণে গ্রাহকদের দাবি পরিশোধে ভয়াবহ জট তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ১২ লাখ বীমা গ্রাহক তাদের প্রাপ্য অর্থের অপেক্ষায় রয়েছেন, যেখানে অনিষ্পন্ন দাবির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪ হাজার ৪০৩ কোটি টাকা।
একজন ভুক্তভোগী মনজুর রহমান ২০১২ সালে ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার জন্য একটি জীবনবীমা পলিসি গ্রহণ করেন। ২০২২ সালে মেয়াদ পূর্ণ হলে তার পাওনা দাঁড়ায় ১১ লাখ ১৯ হাজার টাকা। প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র জমা দেওয়ার পরও তিনি আজও অর্থ পাননি। তিনি জানান, গুরুতর পারিবারিক চিকিৎসা প্রয়োজনেও আংশিক অর্থের জন্য আবেদন করলেও তা মঞ্জুর হয়নি।
আইন অনুযায়ী, বীমা প্রতিষ্ঠানকে সব কাগজপত্র জমা পাওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে দাবি পরিশোধ করতে হয়। তবে বাস্তবে অধিকাংশ কোম্পানি এই নিয়ম মানছে না।
সংকটের পরিসংখ্যান ও চিত্র
নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের তথ্যে দেখা যায়, ২০২৩ সালে ১০ লাখ গ্রাহকের প্রায় ৩ হাজার ৫০ কোটি টাকা অনিষ্পন্ন ছিল। ২০২৫ সালে তা বেড়ে ১২ লাখ গ্রাহক ও ৪ হাজার ৪০৩ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। একই সময়ে দাবি পরিশোধের হার কমে দাঁড়িয়েছে ৬৬.০৬ শতাংশে, যেখানে ২০২০ সালে এটি ছিল ৮৫ শতাংশ।
বিশ্বের গড় দাবি পরিশোধ হার প্রায় ৯৭–৯৮ শতাংশ, এবং প্রতিবেশী একটি বড় অর্থনীতিতে এটি প্রায় ৯৮ শতাংশ, যা বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বেশি।
কোম্পানিভিত্তিক দাবি পরিশোধ পরিস্থিতি
নিচের সারণিতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বীমা কোম্পানির দাবি পরিশোধ পরিস্থিতি তুলে ধরা হলো—
| বীমা কোম্পানি |
মোট দাবি (কোটি টাকা) |
পরিশোধ (কোটি টাকা) |
পরিশোধ হার |
অবশিষ্ট গ্রাহক |
| ফারইস্ট ইসলামী লাইফ |
৩৪৪২ |
২১৪ |
৬% |
৫.৬৬ লাখ |
| পদ্মা ইসলামী লাইফ |
তথ্য সীমিত |
নিম্ন |
৪% |
উল্লেখযোগ্য |
| প্রগ্রেসিভ লাইফ |
তথ্য সীমিত |
নিম্ন |
২১% |
উল্লেখযোগ্য |
| গোল্ডেন লাইফ |
তথ্য সীমিত |
নিম্ন |
১১% |
উল্লেখযোগ্য |
| সানফ্লাওয়ার লাইফ |
তথ্য সীমিত |
নিম্ন |
৫.৫% |
উল্লেখযোগ্য |
| বায়রা লাইফ |
তথ্য সীমিত |
নিম্ন |
১.৬% |
উল্লেখযোগ্য |
| আকিজ তাকাফুল লাইফ |
সম্পূর্ণ পরিশোধ |
সম্পূর্ণ |
১০০% |
নেই |
| আলফা ইসলামী লাইফ |
সম্পূর্ণ পরিশোধ |
সম্পূর্ণ |
১০০% |
নেই |
| লাইফ ইন্স্যুরেন্স কর্পোরেশন |
সম্পূর্ণ পরিশোধ |
সম্পূর্ণ |
১০০% |
নেই |
| মার্কেন্টাইল ইসলামী লাইফ |
সম্পূর্ণ পরিশোধ |
সম্পূর্ণ |
১০০% |
নেই |
অনিয়ম ও আর্থিক দুর্বলতা
বিভিন্ন তদন্ত ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রতিবেদনে দেখা যায়, কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে অর্থ আত্মসাৎ, অতিরিক্ত প্রশাসনিক ব্যয়, দুর্বল বিনিয়োগ এবং সম্পদ ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম সংকটকে আরও গভীর করেছে। বিশেষ করে কিছু কোম্পানির ক্ষেত্রে জমি কেনাকাটায় অতিরিক্ত মূল্য দেখানো এবং ব্যাংক ঋণ গ্রহণ করে তহবিল ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থা একাধিক প্রতিষ্ঠানে প্রশাসক নিয়োগ ও পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করলেও অনেক ক্ষেত্রেই কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং ও বীমা বিভাগের এক অধ্যাপক মনে করেন, দীর্ঘদিনের দুর্বল বিনিয়োগ ও আয় সংকটের কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো দাবি পরিশোধে ব্যর্থ হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে ইচ্ছাকৃতভাবে দাবিও আটকে রাখা হচ্ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বীমা খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোকে একীভূত করা, কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা এবং বাধ্যতামূলক স্বাস্থ্যবীমা চালু করা ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।
উপসংহার
সার্বিকভাবে দেখা যাচ্ছে, ব্যবস্থাপনা দুর্বলতা, আর্থিক অনিয়ম এবং নিয়ন্ত্রণের ঘাটতি বাংলাদেশের জীবনবীমা খাতকে এক গভীর সংকটে ফেলেছে। ফলে সাধারণ গ্রাহকের আস্থা কমে যাচ্ছে এবং দীর্ঘদিন ধরে লাখো মানুষ তাদের ন্যায্য অর্থ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।