দেশের জ্বালানি বাজারে সাম্প্রতিক সময়ে পেট্রল ও অকটেনের সংকট নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ সারি, কোথাও কোথাও জ্বালানি না পাওয়ার অভিযোগ এবং আতঙ্কিত ক্রয়—সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। অথচ সরকারি তথ্য বলছে, দেশে পেট্রলের বড় অংশই স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হয় এবং সামগ্রিকভাবে সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ার মতো পরিস্থিতি নেই। প্রশ্ন উঠছে—তাহলে সংকটের মূল কারণ কী?
পেট্রল ও অকটেনের প্রকৃত ধারণা
পেট্রল মূলত অপরিশোধিত তেল (ক্রুড অয়েল) ও গ্যাসক্ষেত্র থেকে পাওয়া কনডেনসেট শোধন করে তৈরি এক ধরনের তরল জ্বালানি। মোটরসাইকেল, পুরোনো গাড়ি, অটোরিকশা এবং ছোট ইঞ্জিনচালিত যন্ত্রে এটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।
অন্যদিকে অকটেন হলো তুলনামূলক উচ্চমানের মোটর গ্যাসোলিন। অকটেন রেটিং বেশি থাকলে জ্বালানির গুণগত মানও বেশি হয়। সাধারণভাবে ৯২–৯৫ অকটেন রেটিংয়ের জ্বালানি ‘অকটেন’ নামে পরিচিত, আর ৮০–৮৭ রেটিংয়ের জ্বালানিকে পেট্রল হিসেবে ধরা হয়।
দেশে চাহিদা ও সরবরাহ পরিস্থিতি
সরকারি সংস্থা Bangladesh Petroleum Corporation-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে জ্বালানি তেলের মধ্যে ডিজেলের চাহিদা সবচেয়ে বেশি হলেও পেট্রল ও অকটেনের ব্যবহারও উল্লেখযোগ্য।
গত অর্থবছরের চিত্র অনুযায়ী—
- পেট্রল বিক্রি: প্রায় ৪.৬২ লাখ টন
- অকটেন বিক্রি: প্রায় ৪.১৫ লাখ টন
- ডিজেল চাহিদা: প্রায় ৪৩.৫০ লাখ টন
পেট্রল সরবরাহের বড় অংশ আসে দেশীয় শোধনাগার ও বেসরকারি রিফাইনারি থেকে। সরকারি পর্যায়ে প্রধান উৎপাদক প্রতিষ্ঠান হলো চট্টগ্রামের Eastern Refinery Limited, যা আমদানি করা ক্রুড অয়েল থেকে জ্বালানি উৎপাদন করে।
সরবরাহ কাঠামো (সারসংক্ষেপ)
| বিষয় |
পরিমাণ/অবস্থা |
| মোট পেট্রল চাহিদা (মাসিক গড়) |
প্রায় ৪৪ হাজার টন |
| দেশীয় উৎপাদন সরবরাহ |
প্রায় ৩৫ হাজার টন |
| সরকারি শোধনাগারের অবদান |
প্রায় ১৬% |
| বেসরকারি রিফাইনারির অবদান |
প্রায় ৮৪% |
| বর্তমান মজুত (শুরু এপ্রিল) |
প্রায় ১২,৭৫৬ টন |
| মজুত দিয়ে চলার সক্ষমতা |
প্রায় ৯ দিন |
দেশে চারটি বেসরকারি রিফাইনারি—সুপার পেট্রোকেমিক্যাল, পারটেক্স পেট্রো, অ্যাকোয়া রিফাইনারি ও পেট্রোম্যাক্স—কনডেনসেট ও ন্যাপথা প্রক্রিয়াজাত করে বড় অংশের পেট্রল ও অকটেন উৎপাদন করে।
সংকটের মূল কারণ কী?
বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকৃত অর্থে দেশে দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ ঘাটতি নেই। সংকটের প্রধান কারণ তিনটি—
প্রথমত, আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, বিশেষ করে সাম্প্রতিক ইরান–সম্পর্কিত সংঘাতের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম ও সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
দ্বিতীয়ত, আতঙ্কিত ক্রয় বা ‘প্যানিক বায়িং’। হঠাৎ করে অনেকেই প্রয়োজনের চেয়ে বেশি জ্বালানি কিনে মজুত করতে শুরু করেন, যা ফিলিং স্টেশনগুলোতে কৃত্রিম চাপ সৃষ্টি করে।
তৃতীয়ত, সরবরাহ ব্যবস্থায় সাময়িক চাপ ও লজিস্টিক জটিলতা। কিছু আমদানি ব্যাহত হওয়ায় শোধনাগারের কাঁচামাল সংকট তৈরি হয়েছে, বিশেষ করে সরকারি শোধনাগারের ক্ষেত্রে।
পরিস্থিতি কতটা উদ্বেগজনক?
সরকারি হিসাবে বর্তমানে পেট্রলের মজুত স্বল্প হলেও সংকট মোকাবিলার মতো সক্ষমতা রয়েছে। তবে কাঁচামাল আমদানি বিলম্বিত হলে ভবিষ্যতে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। বেসরকারি খাতের রিফাইনারিগুলো এখনো তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল উৎপাদন বজায় রেখেছে।
উপসংহার
সার্বিকভাবে বলা যায়, দেশে প্রকৃত অর্থে উৎপাদন সংকট নয়, বরং আতঙ্ক, বাজারে আচরণগত চাপ এবং আন্তর্জাতিক অস্থিরতার প্রভাব মিলেই পেট্রল সংকটের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সঠিক সরবরাহ ব্যবস্থাপনা ও মজুত নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা গেলে এই সংকট দ্রুতই স্বাভাবিক হতে পারে।