খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ৬ এপ্রিল ২০২৬
দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া এক শিশুর হঠাৎ মুখ বেঁকে যাওয়া এবং হাঁটতে না পারার খবর যেকোনো মা-বাবার জন্য এক দুঃস্বপ্ন। সেই দুঃস্বপ্ন সত্যি হয়েছিল এক মার্কিন দম্পতির জীবনে, যখন তাদের সন্তান ‘মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিজিজ’ নামক এক বিরল জেনেটিক রোগে আক্রান্ত হয়। এই রোগে শরীরের কোষগুলো পর্যাপ্ত শক্তি উৎপাদন করতে পারে না, যার ফলে শিশুটি মেটাবলিক স্ট্রোকের শিকার হয়। চিকিৎসকরা তাকে বিশেষ অ্যামাইনো অ্যাসিড, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং ভিটামিনের সমন্বয়ে ‘মেডিকেল নিউট্রিশন’ বা চিকিৎসা পুষ্টির প্রেসক্রিপশন দিলেও স্বাস্থ্য বীমা কোম্পানিগুলো তা দিতে অস্বীকৃতি জানায়। ফলস্বরূপ, প্রতি মাসে সেই পরিবারকে পাঁচশ ডলারের বেশি ব্যক্তিগত তহবিল থেকে খরচ করতে হচ্ছে।
মেডিকেল নিউট্রিশন কী এবং এর প্রয়োজনীয়তা
মেডিকেল নিউট্রিশন কোনো সাধারণ ডায়েট বা সম্পূরক খাদ্য নয়। এটি এমন এক বিশেষায়িত ফর্মুলা বা খাদ্য উপাদান, যা নির্দিষ্ট রোগের চিকিৎসায় ওষুধের মতো কাজ করে। ফিনাইলকিটোনুরিয়া (PKU), মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিজিজ, সিস্টিক ফাইব্রোসিস, ক্রোনস ডিজিজ এবং আলসারেটিভ কোলাইটিসের মতো জটিল রোগে আক্রান্ত রোগীদের জন্য এটি অপরিহার্য। এই রোগীদের শরীরের স্বাভাবিক বিপাক প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়, তাই তাদের বেঁচে থাকার জন্য বিশেষায়িত প্রোটিন বা অ্যামাইনো অ্যাসিডের প্রয়োজন পড়ে।
নিচে বিভিন্ন রোগে মেডিকেল নিউট্রিশনের ভূমিকা একটি টেবিলের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
| রোগের নাম | নিউট্রিশনের ভূমিকা | বীমা ছাড়াই সম্ভাব্য মাসিক খরচ |
| মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিজিজ | কোষের শক্তি বৃদ্ধিতে এবং স্ট্রোক প্রতিরোধে সহায়তা করে। | ৫০০ – ১০০০ ডলার |
| ফিনাইলকিটোনুরিয়া (PKU) | মস্তিষ্কের ক্ষতি রোধে নিম্ন-প্রোটিনযুক্ত বিশেষ খাদ্য সরবরাহ। | ১০০০ – ২০০০ ডলার |
| সিস্টিক ফাইব্রোসিস | পুষ্টির শোষণ ক্ষমতা বাড়াতে এনজাইম ও বিশেষ ভিটামিন। | ৮০০ – ১৫০০ ডলার |
| জিআই ট্র্যাক্ট ব্যাধি | পরিপাকতন্ত্রের প্রদাহ কমাতে সহজপাচ্য ফর্মুলা। | ৫০০ – ১২০০ ডলার |
আইনি জটিলতা ও বীমা কোম্পানিগুলোর অনীহা
১৯৭২ সাল পর্যন্ত আমেরিকার খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (FDA) এই মেডিকেল ফুডগুলোকে ‘ওষুধ’ হিসেবেই গণ্য করত। কিন্তু পরবর্তীতে উদ্ভাবন ত্বরান্বিত করার লক্ষে এগুলোকে ‘বিশেষ খাদ্য’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়। ১৯৮৮ সালের ‘অরফান ড্রাগ অ্যাক্ট’ এই ব্যবধানকে আরও স্পষ্ট করে। এই আইনি মারপ্যাঁচেরই সুযোগ নিচ্ছে বীমা কোম্পানিগুলো। তারা এই জীবন রক্ষাকারী উপাদানগুলোকে ‘ঐচ্ছিক’ বা কেবল খাদ্য হিসেবে চিহ্নিত করে এর খরচ বহন করতে অস্বীকার করে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, শৈশবে বীমা সুবিধা দিলেও ১৮ বা ২১ বছর পূর্ণ হওয়ার পর তা বন্ধ করে দেওয়া হয়, যদিও রোগটি আজীবন স্থায়ী থাকে।
একটি নতুন আশার আলো: ২০২৫ সালের আইন
বর্তমানে মার্কিন কংগ্রেসে ‘মেডিকেল ফুডস অ্যান্ড ফর্মুলাস অ্যাক্সেস অ্যাক্ট ২০২৫’ নামে একটি বিল উত্থাপন করা হয়েছে। ২০২৩ সালের ৩ অক্টোবর হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভস এবং ২ ডিসেম্বর সেনেটে এটি পেশ করা হয়। এই আইনের মূল লক্ষ্য হলো:
১. মেডিকেয়ার ও মেডিকেইডের মতো ফেডারেল স্বাস্থ্য কর্মসূচির আওতায় মেডিকেল নিউট্রিশনকে অন্তর্ভুক্ত করা।
২. চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী বিশেষায়িত খাদ্যকে ‘মেডিকেল নেসেসিটি’ বা চিকিৎসাগতভাবে অপরিহার্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া।
৩. বয়সের সীমাবদ্ধতা দূর করে আজীবন চিকিৎসা সহায়তা নিশ্চিত করা।
আমেরিকান একাডেমি অফ পেডিয়াট্রিক্স এবং আমেরিকান কলেজ অফ মেডিকেল জেনেটিক্স দীর্ঘদিন ধরে এই পরিবর্তনের দাবি জানিয়ে আসছে। বিজ্ঞান স্পষ্টভাবে বলছে যে, এই ফর্মুলাগুলো কেবল খাবার নয়, বরং এগুলো রোগীদের হাসপাতালে ভর্তি হওয়া থেকে দূরে রাখে এবং দীর্ঘস্থায়ী অঙ্গহানি রোধ করে।
উপসংহারে বলা যায়, একজন মা যখন দেখেন তার সন্তান বিশেষ পুষ্টির কারণে আজ সুস্থভাবে হাই স্কুলে যেতে পারছে, তখন সেই চিকিৎসার খরচ বহন করা কোনো বিলাসিতা নয়, বরং মৌলিক অধিকার। বীমা কোম্পানিগুলোর এই বৈষম্যমূলক আচরণ বন্ধ করার সময় এখনই। কারণ জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসা কেবল অর্থের অভাবে বন্ধ হতে পারে না। এই নতুন আইন পাস হলে কয়েক লক্ষ আমেরিকান পরিবারের আর্থিক ও মানসিক বোঝা লাঘব হবে।